--
Saif BARKATULLAH
সময়টা নব্বই দশক। তখন ক্লাশ সেভেনে পড়ি। আমাদের সাথে আমাদের এলাকার সব প্রভাবশালী ঘরের সন্তানরা একসাথে পড়তাম। স্কুলেও আমাদের ব্যাচটা দাপট নিয়ে চলতাম। খেলাধুলা, পড়ালেখা, রাজনীতি সব বিষয়েই আমাদের ব্যাচটা অন্যরকম ছিল।
তখনও আমাদের এলাকায় সিনেমা হল ছিলনা। বাজারে ভিসিআরে ছবি দেখতো সবাই। লাইলী-মজনু, বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না, কেয়ামত থেকে কেয়ামত-এই ছবিগুলো জনপ্রিয় ছিল সেই সময়। এছাড়া সালমান শাহ-এর প্রায় সব ছবি ( স্বপ্নের পৃথিবী, দেনমোহর, অন্তরে অন্তরে, স্বপ্নের মৃত্যু নেই ) জনপ্রিয় ছিল।
আমি ছবি দেখতাম না। সেভেনে যখন পড়ি, তখন আমার সহপাঠিরা সবাই ধরল, সিনেমা দেখতে হবে। আমি ক্লাশ ক্যাপ্টেন সাথে ক্লাশের ফার্স্টবয়, আবার আমার জেঠা স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক। বাধ্য হয়েই দেখতে হলো সিনেমা।
আমাদের থানায় তখন নতুন একটা সিনেমা হল হয়েছে। বালিজুরি বাজারে অবস্থিত। নাম স্বজন সিনেমা হল। সেই সময় অবশ্য একটা ছবিও মুক্তি পেয়েছিল। স্বজন সিমেনার নাম। ইলিয়াস কাঞ্চন নায়ক আর মৌসুমি নায়িকা। আরেকজন নায়ক ছিল। নাম মনে নেই।
ক্লাশ শেষ করে দুপুরের পর আমরা একসাথে প্রায় বিশজন বাই সাইকেলে চলে গেলাম বালিজুরি বাজারে। আমাদের স্কুল থেকে সিনেমা হল তিন মাইল দূরে ছিল। তখন রাস্তারও পাকাকরনের কাজ চলছিল।
নতুন এক অভিজ্ঞতা । এই প্রথম পড়ালেখা, বাড়ি ছাড়া বাইরে যাচ্ছি। আমরা যথা সময়ে পৌঁছে গেলাম। নতুন সিনেমা হল স্বজন। সেই সাথে নতুন সিনেমাও নাম স্বজন। সিনেমার নামের সাথে হলের নামের কী সুন্দর মিল। আর আমার জীবনের প্রথম ছবি দেখা।
ছবিটাও দেখে খারাপ লাগেনি। গানগুলো সুন্দর ছিল। অশ্লীলতাও ছিলনা। মোটামুটি ভাল বলা চলে। এনিওয়ে সিনেমা শেষ করে যখন ফিরছিলাম। তখন রাস্তার কিছু দূর এসে ঘটে গেল আরেক মজার কাণ্ড। বলছিলাম রাস্তা পাকাকরনের কাজ চলছিল।
আমরা বাইসাইকেলে আসতেছিলাম। হঠাৎ আমাদের সহপাঠি আসাদ সাইকেল উল্টে নিচে পড়ে যায়। যদিও ব্যাথা পায়নি তবুও পোলাপানের মজা নিতে সময় লাগেনি।
শেষে স্বজন সিনেমা হলে স্বজন ছবির মাধ্যমে অভিষেক হয়েছিল সেদিন সিনেমা জগতে প্রবেশ করার। যদিও এখন আর ছবি দেখা হয়না। তবুও মাঝে মাঝে ভাল হিন্তি বা ইংলিশ মুভি দেখতে ভুলিনা।
সকাল ৮টা। ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই মেইল চেক করলাম সাথে টিভি সংবাদ শিরোনামগুলো দেখলাম। তারপর গোসল, ফ্রেশ হয়ে ছুটলাম অফিসের উদ্দেশ্যে। পথে বসে বাসে গতরাতে আসা সেল ফোনে নববর্ষের শুভেচ্ছা বার্তার জবাব পাঠাচ্ছিলাম। সকাল ১০টার অফিস, পৌঁছলাম ১০.৪৭। প্রচণ্ড যানজট আর প্রচন্ড গরম। অফিসে পৌঁছেই নিউজ এডিট আর সাড়ে বারোটার বুলেটিন এর কাজ শেষ করে পত্রিকার ওয়েব সংষ্করণগুলো চোখ বুলাচ্ছি। এ সময় অন্যান্য কলিগদের সাথে নববর্ষের শুছেচ্ছা বিনিময় করলাম।
দুপুরে লাঞ্চ সেরে নির্ধারিত অ্যাসাইন্টমেন্ট-এ বের হলাম। অফিস থেকে গাড়ীতে গিয়ে নীলক্ষেত মোড়ে নেমে হাঁটা শুরু করলাম। নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে রাজধানীর রমনা বটমূল, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা জুড়ে তখন উৎসবমুখর মানুষের ঢল। নানা রঙ্গের পোশাকে রঙ্গিন পুরো এলাকা। যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই যেন অপরূপ সব ক্যানভাস।
নতুন বছরের বৈশাখী উৎসব বাঙালির প্রাণের উৎসব। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার প্রাণের উৎসব। বৈশাখী উৎসবের সঙ্গে মিশে আছে কোটি বাঙালির সত্ত্বা। টিএসসির সামনে দিয়ে হাঁটছি। পাশে শিশু-শিক্ষার্থী, তরুণ-তরুণী মিলিয়ে প্রায় শতাধিক শিল্পী মঞ্চে উঠে সম্মিলনী গানের সুরের মূর্ছনায় টিএসসি চত্বর। যেন সুরের আবহে ছুঁয়ে যায় বাঙালির প্রাণকে।
দেখলাম রাস্তায় দাঁড়িয়ে তরুণ-তরুণী-শিশুদের গালে আলপনা আঁকছিলেন। সাথে বেশিরভাগ মেয়ের পরনে ছিল লাল-সাদা শাড়ী। চুলে বেলি বা রজনীগন্ধা ফুলের মালা। লাল-সাদা পাঞ্জাবী আর বাহারী ফতুয়া পরে ইচ্ছে মতো সেজে এসেছিলেন ছেলে-বুড়ো সবাই।
শাহবাগ থেকে দোয়েল চত্বর, নীলক্ষেত থেকে টিএসটি সবখানেই বসেছিলো বৈশাখী মেলার পসরা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নাগরদোলা, পুতুল নাচ, আর বাঁশ কাঠের কারুশিল্পের বাহারী দোকানপাট।
বিকেল ৫টা। চলে আসলাম আবার অফিসে। বৈশাখী মেলার রিপোর্টটা শেষ করে রাতে বাসায় ফিরছিলাম। মীরপুর-১০ নম্বর নেমে পড়লাম বৈশাখী ঝড়ের কবলে। মীরপুর -১১ পর্যন্ত কোন রকম ভাবে পৌঁছলাম। তারপর বৃষ্টিতে আটকা থাকলাম প্রায় সোয়া এক ঘন্টা। শরীর তখন প্রচন্ড ক্লান্ত।
বৃষ্টি একটু কমে আসলে বাসায় ফেরার চেষ্টা করলাম। কোন রিক্সাই সে সময় আসতে চাইছে না। কী আর করা। হেঁটেই পথচলা শুরু করলাম। অন্ধকার। পাঁচ মিনিট হাঁটার পর মনে হলো বাসায় তো গিয়ে রান্না করতে হবে, তারচেয়ে বরং হোটেল থেকে খেয়ে যাই। শেষে তাই করলাম। বাসায় যখন পৌছলাম তখন রাত ১১.৩৮। ইলেকট্রিসিটি নেই। সেল ফোনের লাইটে মোমবাতি খুঁজে জ্বালালাম। আমার দুই পায়ে তখন প্রচণ্ড ব্যাথা অনুভব করছি। সারা দিনের ক্লান্তি আর রাতে পায়ের প্রচন্ড ব্যাথা নিয়ে কখন যে চলে গেছি ঘুমের রাজ্যে........।
এভাবেই কেটেছে বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন।