Pages

Tuesday, July 13, 2010

ডাক্তার বাড়িতে নানা রঙের দিন


৬ মে ২০১০। বৃহস্পতিবার। সময়টা একটু গরম, এক পশলা মেঘ, একটু বৃষ্টি । চারদিক কেয়া, কদম ফুলের সুবাসিত সৌরভ। রাত তখন বাজে পৌণে দশটা। ফেনীর সোনাগাজী যাবো।

ফেনী বাস স্ট্যাণ্ড থেকে ডানে টার্ণ নিয়ে সোজা সামনে দিকে যাচ্ছি। চারপাশ অন্ধকার। বর্তমান ঢাকার লোডশেডিং এর হাওয়া ফেনীতে ভালমতোই বুঝা যাচ্ছে।

সামনে যাচ্ছি। কিন্তু গাড়ী চালক রনি এর পূর্বে একবার এসেছিল সোনাগাজীতে। ফলে ঠিকমত অন্ধকারে গন্তব্য চিনতে পারতেছিলনা। আর আমি জীবনে এই প্রথম এসেছি।

কী আর করা। যাচ্ছি তো যাচ্ছি। সামনেই এক বাজার। নাম ধলিয়া। ঔ বাজার ক্রস করতেই রাস্তার বামে ক্রস করতে রিক্সার সাথে আমাদের গাড়ীটা লেগে গেল। চারপাশ অন্ধকার। আমি শুধু চেয়ে দেখলাম রিক্সাচালক ভাইটি মাটিতে পড়ে গেল আর রিক্সাটা উল্টা দিকে ধপাস।

ওহ!! বুকের মধ্যে তখন আমার ৯০ ডিগ্রি হার্টবিট উঠানামা করছে। পরে খোঁজ খবর নিয়ে যানতে পারি রিক্সাওয়ালা কোন গুরুতর আঘাত পাননি। তবুও আমাদের মনে প্রচণ্ড খারাপ লাগল। রনিকে অনেক বলা সত্ত্বেও গাড়ীটা ব্যাক করলনা। আমরা গাড়ীতে বসা সবাই বলতেছি অন্তত রিক্সাওয়ালা ভাইটিকে দুঃখিত বলা দরকার। কিন্তু রনি খুবই শক্ত। ও গাড়ী শাঁ শাঁ করে চালিয়ে নিয়ে গেল নির্দিষ্ট গন্তব্যের প্রায় আধ ঘন্টার পথ দূরে। এমনিতেই বিদ্যুৎ নেই। চারদিকে অন্ধকার। আমরাও খুঁজে পাচ্ছিনা ডাক্তার বাড়িটা।

কী আর করা। বাধ্য হয়ে আবার আমরা উল্টা দিকে আসতে থাকলাম। নানা অস্থিরতার পর খুঁজে পেলাম বাড়িটি।

সুনসান নীরবতা। গাছগাছালিতে পাখিদের কিচির মিচির। মাঝে মাঝে দু-একটা ঝিঝি পোকার শব্দ। ব্যাগ থেকে ফায়ার বক্স (দিয়াশলাই) বের করে গাড়ী থেকে নামলাম। ডাক্তার বাড়ীতে আমরা যে ঘরে থাকব সে ঘরের চাবিটা ছিল ঐ বাড়িতে অবস্থানরত ডা. ইকরামুল হক এর কাছে। তাঁর সেলফোনে কল করতেই উনি ঘর থেকে বের হলেন। সাথে আরো কয়েকজন ( লিমার হাতে চার্জার লাইট )।

আমরা ঘরের ভেতর প্রবেশ করলাম। সাথে সাথে বিদ্যুৎ চলে আসল। দীর্ঘ একমাস পর তালাবদ্ধ ঘর যেন মূহুর্তের মধ্যেই বাতিঘরে পরিণত হল। নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল।

নানা রঙের দিন...

৪ জানুয়ারি, ১৯৬৪ সাল। সেই সময় নাম ছিল চৌধুরী বাড়ী। বর্তমানে ডাক্তার বাড়ী। মাঝে অতীত হয়ে গেছে সর্দার বাড়ী নামটা। বর্তমান মহাজোট সরকার নাম বদলের যে ইতিহাস রচনা করেছেন, এই বাড়ীটি সেই ইতিহাসকে ছাড়িয়ে (সম্ভবত) গ্রিনেজ বুক অব ওর্য়াল্ড-এ উঠে যাবে।

প্রিয় পাঠক, হয়তো আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, ডাক্তার বাড়ীতে আমার প্রথম আসা কিন্তু নানা রঙের দিন- শিরোনাম কেমনে হয়? প্রসঙ্গত বলব, এই বাড়ীতে পরিচয় হয় এক ভাবীর সাথে। বর্তমান বয়স তাঁর প্রায় সত্তর বৎসর। নানান কথা জানতে জানতে উনি বলল, সেই সময়কার নানা রঙের দিনের স্মৃতি।

ডাক্তার বাড়ীর সবাই এই ভাবীকে মুক্তা ভাবী বলে ডাকত। ভাবীর বাপের বাড়ী কুমিল্লায়। ১৯৬৪ সালের ৪ জানুয়ারি গোলাম মোস্তফার সাথে পরিণয়নসুত্রে ডাক্তার বাড়ীতে আসেন।

দেবর-ননদ-ভাসুর-ভাগ্নে-ভাগ্নী-পাড়া প্রতিবেশী সবাই মিলে ২২০ জন ভাবীর বিয়েতে যায়। প্রথম শ্বশুর বাড়ীতে যখন আসেন তখন ভাবী অন্য এক স্বাপ্নিক রাজ্যে অবস্থান করছেন।

চারদিক থেকে সবাই আসছেন তাকে দেখতে। সেই সময় নতুন বউকে সবসময় ঘোমটা পরে থাকতে হতো। শুধুমাত্র স্বামীর সামনে ঘোমটা খুলতে পারতো। অন্য পুরুষের সামনে যেতে পারতনা। উচ্চস্বরে কথা বলতে পারত না। শ্বশুর-শ্বাশুড়ির কথা মতো সব কিছু মেনে চলে জগৎ সংসার চালাত। অন্যরকম একটা পরিবেশ ভাবীকে প্রতিদিন পৃথিবীর সোনালী জীবনের এক নাট্যমঞ্চে অভিনয় করতে হতো।

এভাবেই দিন-মাস-বছর পেরোতে থাকে। বছর এক পরেই পৃথিবীতে আসে নতুন এক সন্তান। তখন ভাবী পুরোপরি এক গৃহিনীতে রূপান্তরিত একজন মহিলা। প্রতিদিন স্বামীর অফিসে যাওয়ার সময় সব কিছু প্রয়োজনীয় কাজ গুছানো, বাচ্চাকে লালন করা, শ্বাশুড়ির আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা-ইত্যাদি নানা কাজের সব বিচিত্র সাংসারিক আয়োজনে ব্যাস্ত। এভাবেই দিন কেটে যায় ভাবীর।

কথা প্রসঙ্গে সেই সময় আর বর্তমান সময় এর সাংসারিক কী কী পরিবর্তন হয়েছে জানতে চাইলে ভাবী জানালেন, বর্তমান সময়টা অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এখন আর আগের মতো সংসার জীবন নেই। এখন নতুন বউরা ঘরে এসেই স্বামী ছাড়া অন্য কাউকে ( শ্বশুড়-শ্বাশুড়ী-দেবর-ননদ) সহজে চিনতেই চায়না। বিয়ের পরপরই আলাদা সংসার করতে চায়। যা আমাদের সময় ছিলনা। আর পর্দাতো করতেই চায়না। এমনকি মাথায় কাপড় পর্যন্ত দিতে চায়না।

খুব প্রতিবাদের সুরে বললেন, এই দেখ, কয়েকদিন আগে ঢাকা থেকে সোনাগাজীতে আসতেছিলাম। তো তখন আসরের সময়। মাইকে আজান হচ্ছে। দেখলাম ওই বাসে বারো জন মহিলা ছিল। অথচ আজান শুনার সাথে সাথে মাত্র চার জন মহিলা মাথায় কাপড় দিল। ব্যাপারটা আমার কাছে লক্ষ্যনীয়। আসলে এভাবেই পরিবর্তন হয়েছে এখনকার সমাজ।

জোনাকী পোকার সাথে কিছুক্ষণ

এভাবে ভাবীর সাথে আলাপচারিতায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। সন্ধ্যার আধঘন্টা পরে বিদ্যুৎ চলে গেল। আমি, রনি চলে গেলাম ডা. বাড়ির সামনে রাস্তায়। রাস্তার পূর্বদিকে একটা ছোট সাকোঁ। সাকোঁটার পাশে ছোট্ট ডোবাশয়। তখন অন্ধকার রাত। অথচ এই ডোবাশয়ে দেখলাম হাজারো জোনাকী পোকার মিটিমিটি আলো। সাথে ঝি ঝি পোকার কলকাকলী। রনি আমাকে বলল, সাইফ ভাই, দেখেন আল্লাহর কী অপরূপ সৃষ্টি। প্রায় ত্রিশ-চল্লিশ হাজার জোনাকী একসাথে আলো ছড়াচ্ছে। আমি জীবনেও দেখিনি। আমরা কিছুক্ষণ জোনাকীর সাথে কাটালাম।

Saturday, June 5, 2010

জানালার পাশে ছোট্টো মেয়ে তোত্তো-ছান




জানালার পাশে ছোট্টো মেয়ে তোত্তো-ছান । এ বইয়ের লেখক কুরোয়ানাগি তেতসুকো হচ্ছেন জাপানের বিখ্যাত কথাশিল্পী, টিভি অনুষ্ঠানের উপস্থাপক এবং জাতিসংঘ শিশু তহবিলের বন্ধুত্বের দূত। তাঁর প্রথম প্রতিনিধিত্বকারী সাহিত্যকর্ম জানালার পাশে ছোট্টো মেয়ে তোত্তো-ছান ১৯৮১ সালে জাপানে প্রথম প্রকাশিত হয়। ২০০১ সাল পর্যন্ত এ বইয়ের জাপানী ভাষা সংস্করণের বিক্রির পরিমাণ ছিল ৯৩ লাখ ৮০ হাজার। জাপানে প্রতি তিনটি পরিবারে এ বইটি আছে।

বইটি ৩৩টি ভাষায় অনুবাদ করা হয়ছে। এ বইয়ের ইংরেজী সংস্করণ যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশের সময় নিউইয়র্ক ডেইলি পত্রিকায় বইটি প্রসঙ্গে গোটা দু'পাতার মন্তব্য প্রকাশিত হয়। আগে এ পত্রিকা কখনও এমন মন্তব্য প্রকাশ করেনি এবং পরেও করেনি। জাপানের ভেতরেই এ বইয়ের ইংরেজী সংস্করণের বিক্রীর পরিমাণ ৭ লাখে দাঁড়িয়েছে এবং এ পর্যন্ত এই সংখ্যা সর্বোচ্চ।

জানালার পাশে ছোট্টো মেয়ে তোত্তো-ছান নামে বইটিতে প্রাথমিক স্কুলে অর্জিত একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা লেখক বর্ণনা করেছেন। ৭ বছর বয়সী তোত্তো-ছান বড় মানুষের চোখে অবশ্যই একজন ভালো শিশু নয়। তার দুষ্টুমির কারণে সে স্কুল ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। তার মা একজন বিনম্র নারী। তিনি তোত্তো-ছানকে একটি বিশেষ স্কুলে পাঠিয়েছেন। এ স্কুলে আবর্জনাবাহী রেলপথের গাড়িকে কাসরুম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। শিশুরা যার যার নিজের ইচ্ছা মতো স্বাধীনভাবে বিভিন্ন বিষয় এখানে শেখে। তাদের বসার আসন নেই এবং বিভিন্ন কাসের শিশুরাও একসাথে বসতে পারে। স্কুলের প্রিন্সিপাল সোসাকু কোবায়াশি শিশুদের প্রকৃতিদত্ত প্রশিণের ওপর গুরুত্ব দেন এবং তাদের পুরোপুরি স্বাধীনভাবে লেখাপড়ার অবকাশ যোগান। প্রিন্সিপাল শিশুদেরকে 'পাহাড়ের গন্ধ' এবং 'সাগরের গন্ধের' খাবার অনুরোধ জানায়। পাহাড়ের গন্ধের খাবার যেমন সবজি ও মাংশ এবং সাগরের গন্ধের খাবার তেমন মাছ ও সমুদ্র শেওলা। তিনি প্রত্যেক শিশুদের উত্কৃষ্টতা প্রদর্শনে নিয়মিত খেলাধুলার আয়োজন করেন। সকালে যদি সব বিষয়ের পড়া শেষ হয়ে যায় তাহলে বিকেলে সবাই মিলে বাইরে বেড়াতে গিয়ে ভূগোল ও প্রকৃতির কাছ থেকে শেখে। রাতে প্রিন্সিপাল শিশুদের নানা ধরনের গল্প শোনান। তাই তোত্তো-ছানের মতো অনেক শিশু মন থেকে সত্যিকারভাবেই মুগ্ধতার ভেতর বড় হয়ে উঠেছে। প্রিন্সিপাল মাঝে মাঝে তোত্তো-ছানকে বলেন, তুমি সত্যিই একটি ভালো শিশু। প্রিন্সিপালের যতেœ এবং সঠিক নির্দেশনায় সাধারণ মানুষের চোখে অবাঞ্ছিত শিশুরা ধীরে ধীরে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য শিশুতে পরিণত হয় এবং তাদের জন্য সারা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি গড়ে ওঠে। তোত্তো-ছান এ স্কুলে অন্যের প্রতি যতœ নিতে এবং জীবনকে ভালোবাসতে শিখেছে। ১৯৪৫ সালে এ স্কুলটি যুদ্ধের কারণে বিধ্বস্ত হয়। এ বইটিতে তোত্তো-ছানের মনের অনুভূতি গভীরভাবে প্রকাশ পেয়েছে। পাঠকরা তোত্তো-ছানের দৃষ্টি থেকে সে ধরণের বড় হওয়ার প্রক্রিয়া উপভোগ করতে পারেন।

রেডিও চায়না অবলম্বনে

Sunday, May 30, 2010

৭৩৬ জন বন্ধুর সাথে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম


গতরাতে শুয়ে শুয়ে ভাবতেছিলাম। হঠাৎ আমার মুঠোফোনে একটা মেসেজ আসল। খুলে দেখি ব্রেকিং নিউজ। তাতে লেখা ফেসবুক ব্লকড ইন বাংলাদেশ। মুহূর্তেই মনটা বিষণ্ণ হয়ে গেল। খবরটা নিষ্চিত হবার জন্য রেড়িও এবিসির রাতের শো ক্যাফে ৮৯.২ তে আরজে কিবরিয়াকে মেসেজ দিলাম। উত্তরে বলল, ফেসবুক হেচ বিন শার্ট ডাউন।
হায় আল্লাহ। এটা কী হল। প্রতিদিনের নিত্য যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ছিল ফেসবুক। বিশেষ করে আমার প্রিয় আপু মুক্তি [ বর্তমানে লন্ডনে বসবাসরত ] । তার সাথে আমি ২/৩ দিন পরপরই ফেসবুকে যোগাযোগ করতাম। জাতিসংঘে কর্মরত ভাইয়া জহির [বর্তমানে সুদানে আছেন ] । তার সাথে একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম ছিল ফেসবুক। কানাডা, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ প্রায় ৩০টিরও অধিক দেশে আমার সংবাদিক-লেখক-সাহিত্যিক বন্ধু আছে যাদের সাথে আর যোগাযোগ করতে পারবনা ভাবতেই অবাক লাগে।

Thursday, May 13, 2010

সম্ভাবনার বাংলাদেশ [৮ম কিস্তি ]




[সুজলা সুফলা শষ্য শ্যামল আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। এ দেশে রয়েছে অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ। এ সম্পদ সঠিক ভাবে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক সমৃদ্ধশালী দেশ। এসব সম্ভাবনার কথা নিয়ে এই বিশেষ রচনাটি আরটিএনএন এর পাঠকদের জন্য ধারাবাহিকভাবে লিখছেন সাইফ বরকতুল্লাহ । আজ প্রকাশিত হল এর ৮ম কিস্তি।]

১. গারোর বুকে মধুটিলা হতে পারে কোটি টাকার রাজস্ব
শেরপুরের সীমান্তবর্তী নালিতাবাড়ী উপজেলার গারো পাহাড় এলাকায় নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক নৈস্বর্গ মধুটিলা ইকোপার্ক এখন হাজারো ভ্রমণপিপাসুর পথ চারণায় মুখর। ময়মনসিংহ বন বিভাগ ১৯৯৯ সাল থেকে নালিতাবাড়ী উপজেলার সমশ্চূড়া ইউনিয়নের ২৯০ একর এবং পোড়াগাঁও ইউনিয়নের ৯০ একরসহ মোট ৩৮০ একর পাহাড়ি টিলার ওপর মধুটিলা ইকোপার্কে এর প্রাথমিক অবকাঠামো ও সৌন্দর্য বৃদ্ধির কাজ দুই দফায় প্রায় ৪কোটি টাকা ব্যয়ে শেষ করে। এরপর ২০০৬-০৭ অর্থ বছর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইকো পার্কের যাত্রা শুরু হয়।
শুরুর বছরেই ইকোপার্কের বিভিন্ন খাত থেকে সরকারের রাজস্ব খাতে জমা হয় ৫২ হাজার ৮৩১ টাকা। এরপর ২০০৭-০৮ অর্থ বছরে ১৩ লাখ ৬৯ হাজার ৬৫৮ টাকা এবং ২০০৮-০৯ অর্থ বছরে আয় হয় ২৮ লাখ ৩৯ হাজার ৩০৬ টাকা।
চলতি অর্থ বছরে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা আয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।
প্রতি বছর এই পার্কে বিশেষ করে শীত মওসুমে প্রতিদিন শ’ শ” বাস, মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার, মটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনে করে শেরপুরসহ দেশের প্রান্ত থেকে হাজার হাজার দর্শনার্থী পিকনিক, শিা সফর ও ভ্রমণে আসে।
সূত্র জানায়, এই ইকোপার্কে বর্তমানে সুদৃশ্য প্রধান ফটক, ডিসপ্লে মডেল, তথ্য কেন্দ্র, গাড়ি পার্কিং জোন, ক্যান্টিন, ওয়াচ টাওয়ার, মিনি চিড়িয়াখানা, মনোরম লেক ও বোটিং, স্টার ব্রিজ, স্ট্রেম্পিং রোড বা সুউচ্চ পাহাড়ে উঠার জন্য ধাপ রাস্তা (সিঁড়ি), মিনি শিশু পার্ক, মহুয়া রেস্টহাউজ, স্টিলের ছাতা, ইকো ফ্রেন্ডলি ব্রেঞ্চ, আধুনিক পাবলিক টয়লেট, পার্কের প্রবেশ পথ ধরে যাওয়া বিভিন্ন সড়কের পার্শ্বে স্থাপন করা হয়েছে হাতি, হরিণ, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, সিংহ, বানর, কুমির, ক্যাঙ্গারু, মৎস্য কন্যা, মাছ, ব্যাঙসহ বিভিন্ন জীব জন্তুর ভাস্কর্য।
এছাড়া বিরল প্রজাতি, পশু পাখি আকৃষ্ট, ও সৌন্দর্য বর্ধক প্রজাতির গাছের বাগান, মৌসুমী ফুলের বাগান এবং সাত রঙের গোলাপ বাগান রয়েছে।
এসব উপভোগের জন্য ইকোপার্কে ঢুকতে প্রবেশ মূল্য ধরা হয়েছে প্রাপ্তবয়স্ক প্রতিজন ৫ টাকা এবং শিশু কিশোরদের জন্য ২ টাকা। বাস, ট্রাক ও মিনিবাস ৫০ টাকা, মাইক্রোবাস ও জিপ ৩০ টাকা, বেবি ট্যাক্সি বা অটো রিক্সা ১৫ টাকা,
এছাড়া ইকোপার্কের ভেতরে পেডেল বোট ১২ টাকা, নৌকা চালানো ৬ টাকা, ওয়াচ টাওয়ারে উঠা প্রতিজন ২ টাকা, নাটক বা চলচ্চিত্রের শুটিং (৮ ঘন্টা) ১০০০ টাকা, রেস্টহাউজ ভাড়া (শুধুমাত্র দিনের বেলা) ৪৫০০ টাকা, শিশু পার্কে ২ টাকা এবং টয়লেটসহ গোল ঘরের (রান্না-বান্না ও খাওয়া-দাওয়া জন্য সুব্যবস্থা) প্রতিদিন ৬০০ টাকা।
মধুটিলা ইকোপার্ক ঘিরে শেরপুরের পরিচিতি দ্রুত প্রসার ঘটায় জেলার সচেতন মহল মনে করছে, সরকারের উচিত এই ইকোপার্ককে পর্যটন খাতে নিয়ে দেশের অন্যতম একটি পর্যটন কেন্দ্র করা হলে সীমান্তবর্তী এই গারো পাহাড় এলাকার অবহেলিত পাহাড়ি জনসাধারণের ভাগ্যের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও বেকার সমস্যার সমাধান হতে পারে। সেইসঙ্গে দেশের রাজস্ব খাতেও যোগ হবে বাড়তি আয়।

২. ব্যাঙ ও ফড়িং দিয়ে মশক নিধন
[ মাত্র কয়েক হাজার টাকায় উৎপাদন করা যাবে লাখ লাখ ব্যাঙাচি ও নিম্ফ ]

ব্যাঙ এবং ফড়িং দিয়ে সহজেই মশা নিধন সম্ভব। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কবিরুল বাশার পরিবেশবান্ধব এই সহজ পদ্ধতিটি উদ্ভাবন করেছেন। যেকোনো ধরনের মশা জন্মলগ্নেই নিধন করবে ব্যাঙ এবং ফড়িং। তিকর রাসায়নিক মশা নাশকের প্রাকৃতিক বিকল্প হিসেবে শতভাগ সফলতার সঙ্গে এদের ব্যবহার করা যাবে। এতে সাশ্রয় হবে সরকারের কোটি কোটি টাকা। তবে এ জন্য সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি দরকার মানুষের সচেতনতা। ব্যাঙ এবং ফড়িং না মেরে তাদের নিরাপদ আবাস গড়ে তুলতে হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কবিরুল বাশার ব্যাঙ এবং ফড়িং দিয়ে মশা দমনের এ পরিবেশবান্ধব ও সহজ পদ্ধতিটি উদ্ভাবন করেছেন।
জানা গেছে, ব্যাঙ, ফড়িং এবং মশা এ তিনটি প্রাণীই তাদের জীবনের প্রথম দশায় পানিতে বাস করে। ব্যাঙের ব্যাঙাচি, ফড়িংয়ের নিম্ফ (অপূর্ণাঙ্গ দশা) এবং মশার লার্ভা (শুককীট) একই ধরনের পানিতে জন্মগ্রহণ করে। জীবনকালের শুরুর এ সহাবস্থানের কারণেই কবিরুল বাশার মশা দমনে ব্যাঙ এবং ফড়িংকে কাজে লাগানোর চিন্তা করেন। পরবর্তীকালে গবেষণাগার এবং উন্মুক্ত জলাশয় উভয় েেত্রই তিনি ব্যাঙাচি ও নিম্ফ দিয়ে মশা দমনে চমৎকার ফল পান। ব্যাঙাচি ও ফড়িংয়ের নিম্ফ মশার লার্ভাকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে।
তিনি জানান, ব্যাঙাচি ও ফড়িংয়ের নিম্ফ দিয়ে মশা দমন সাশ্রয়ী, সহজ প্রয়োগযোগ্য, পরিবেশবান্ধব, প্রাণী তথা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও নিরাপদ। একই সঙ্গে এ পদ্ধতি মানুষকে রাসায়নিক মশানাশকের ব্যবহার থেকে সরে আসতে সাহায্য করবে। ফলে রাসায়নিক মশানাশকের তিকর প্রভাব থেকে রা পাবে মানুষ।

কবিরুল বাশার জানান, জলাশয়ে স্বাভাবিকভাবে জন্মগ্রহণ ছাড়াও গবেষণাগারে খুব সহজেই ব্যাঙাচি বা নিম্ফ উৎপাদন করা যায়। নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রার কন্ট্রোল ইনসেক্ট রিআরিং হাউস স্থাপন করে বছরজুড়ে ব্যাঙাচি ও নিম্ফ উৎপাদন করা যাবে। হাউসটি স্থাপন করতে খরচ পড়বে প্রায় সত্তর লাখ টাকা। কিন্তু মাত্র কয়েক হাজার টাকায় উৎপাদন করা যাবে লাখ লাখ ব্যাঙাচি ও নিম্ফ। হাউসটিও ব্যবহারযোগ্য থাকবে আজীবন। হাউনে ব্যাঙাচি ও নিম্ফ উৎপাদন করে ঢাকাসহ দেশের মশাপ্রবণ এলাকাগুলোর জলাশয়ে ছেড়ে দিলে মশা প্রাকৃতিকভাবেই প্রায় শতভাগ দমন করা সম্ভব হবে। ব্যাঙ শুধু ব্যাঙাচি দশায় মশা ভণ করলেও ফড়িং নিম্ফ দশা ও পূর্ণবয়স্ক উভয় দশাতেই মশা খেয়ে থাকে।
কবিরুল বাশার ফাইলেরিয়া বা গোঁদ রোগের বিস্তারে কিউলেক্স মশার ভ‚মিকা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে মশাটি দমনের পদ্ধতিগুলো উদ্ভাবন করেন। কিউলেক্স কুইনকুইফেসিয়েটাস মশা ফাইলেরিয়া রোগের বিস্তার ঘটায়। ঢাকার মশার মধ্যে প্রায় ৯০ ভাগই হচ্ছে এই কিউলেক্স মশা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ১৯৯৭ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী বছরে বিশ্বের ৭৩টি দেশের বারো কোটি লোক ফাইলেরিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। বাংলাদেশের ৩৪টি জেলায় ফাইলেরিয়ার প্রাদুর্ভাব রয়েছে। এর মধ্যে ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর ও মেহেরপুর জেলায় এ রোগের প্রাদুর্ভাব তুলনামূলকভাবে বেশি। রোগটি দমনে ওইসব অঞ্চলে সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচ বছর মেয়াদি ডোজ বিলিয়ে থাকে। এ প্রজাতির মশা ডোবা, নর্দমা, নালা, ড্রেন, পচা পুকুর ও জমে থাকা ময়লাপানিতে বংশবিস্তুার করে। এসব পানিতেই জন্মে ব্যাঙাচি ও নিম্ফ।
তিনি জানান, নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রার জন্য কন্ট্রোল ইনসেক্ট রিআরিং হাউস স্থাপন করতে হবে। এজন্য তিনি এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বরাবর সত্তর লাখ টাকার একটি প্রজেক্ট দাখিল করেছেন। প্রজেক্ট পাস হলে বছরজুড়ে সারা দেশের মশা নিধনের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ নিম্ফ ও ব্যাঙাচি উৎপাদন করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন মশাপ্রবণ এলাকার জলাশয়গুলোতে নিম্ফ ও ব্যাঙাচি ছেড়ে দিলে মশা নিধনে সরকারকে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে রাসায়নিক মশানাশক ব্যবহার করতে হবে না। বরং প্রাকৃতিক উপায়েই মশা প্রায় শতভাগ দমন করা সম্ভব হবে। তবে এর জন্য সরকারের উদ্যোগের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সচেতনতাও দরকার। ব্যাঙ এবং ফড়িং না মেরে তাদের নিরাপদ আবাস গড়ে তুলতে হবে। ব্যাঙাচি ও নিম্ফ দিয়ে একমাত্র এডিস মশা নিধন করা সম্ভব হবে না। এছাড়া অন্যান্য সকল প্রকারের মশাই নিধন করা যাবে।
৩. আলু রফতানির অপার সম্ভাবনা
বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরব, দুবাই, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও শ্রীলঙ্কায় আলু রফতানির সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। ভারত উল্লেখিত দেশগুলোতে কমবেশি প্রায় ২শ মার্কিন ডলারে প্রতিটন আলু রফতানি করছে। অপরদিকে পাকিস্তান রফতানি করছে প্রতিটন প্রায় ১শ ৯০ মার্কিন ডলারে।
ইতিপূর্বে বাংলাদেশ থেকে দুবাই আলু রফতানি করা হয়েছে টন প্রতি প্রায় ২শ ২০ মার্কিন ডলারে। বাংলাদেশকে ভারত ও পাকিস্তানের সাথে প্রতিযোগিতা করে বিশ্ববাজারে আলু রফতানি করতে হলে তাদের কাছাকাছি দামে আলু রফতানি করতে হবে অথবা আলু রফতানির অনুক‚লে নগদ সহায়তার পরিমাণ বাড়াতে হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়া গেলে দুবাই, সৌদি আরব, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বে আলু রফতানির সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাবে বলে রফতানিকারকরা জানান। উল্লেখ্য, সারাদেশে এ মৌসুমে আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। সরকার আলু বীজ, সার ও কীটনাশক ওষুধের মূল্য হ্রাস করায় এবং আবহাওয়া অনুক‚লে থাকার কারণেই এবার আলু উৎপাদনের ল্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।

চলতি বছর দেশে প্রায় ৭৫ লাখ টন আলু উৎপাদনের ল্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। উৎপাদন ল্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে গিয়ে কমবেশি ১ কোটি টনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
সুতরাং উপরের বিষয় সমূহ যদি প্রপারলি ইম্পি­মেনটেশন করা যায় তবে বাংলাদেশ আরো এগিয়ে যাবে।
[ চলবে ]

তথ্যসূত্র : ১.দৈনিক ইত্তেফাক ২. দৈনিক নয়াদিগন্ত ৩. আরটিএনএন ৪.দৈনিক সমকাল

Wednesday, May 5, 2010

উপন্যাসের উপাত্ত প্রয়োজন শুধু প্রেম উপজীব্য নয়


সাইফ বরকতুল্লাহ : লেখালেখির শুরু কবে থেকে?
তাহমিনা কোরাইশী : ছোট বেলা থেকে সাহিত্য পরিমন্ডলে বেড়ে ওঠা। শানি-নগর নানা বাড়ির শেষ মাথায় প্রফেসর মনসুর উদ্দীনের বাড়ি। তিনি আমার নানীর বড় ভাই। আমার খালা লেখিকা হাজেরা নজরুল। এ বাড়িতে অনেকেই আসতেন কবি, কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক তাঁদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছি। প্রথম লেখার হাতেখড়ি ১৯৬৬ সালে স্কুলের দেওয়াল পত্রিকায়। তখন থেকে জাতীয় দৈনিকে লিখেছি ছোটদের পাতায়। গল্প, কবিতা, ছড়া। দৈনিক আজাদের মুকুলের মহফিল, ইত্তেফাকের কচিকাঁচার আসর, পাকজমাহুরিয়াত, বাংলার বাণীর সাত ভাই চম্পা, পূর্বদেশের চাঁদের হাট, দৈনিক জনকণ্ঠ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লিখেছি।
ছোটদের পাতায় লিখতে লিখতে আমার বেড়ে ওঠা। ঐ সময় যারা আমার সাথে লিখেছে সেই বন্ধুরা আজ প্রত্যেকেই প্রতিষ্ঠিত লেখক। অনেকেই এক নামে পরিচিত। সুখ্যাতির শীর্ষে তারা। আমি ওদের সঙ্গে চড়তে পারিনি সিঁড়ি। কিন' আমি খুশি কারণ ওরা আমার বন্ধু।

আমরা জানি আপনি বিমান বাংলাদেশে এয়ারলাইন্সে দীর্ঘদিন কর্মরত ছিলেন। এইযে সাহিত্যচর্চা, চাকরি, সংসার, সন-ান, লেখাপড়া একসাথে কি ভাবে করলেন? ১৯৭৬ সাল পর্যন- লেখালেখির মধ্যে ছিলাম। আমার অবশ্য বেশ অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যায়। যখন রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অর্নাস প্রথম বর্ষের ছাত্রী। ১৯৭৩ জানুয়ারিতে বিয়ে হয় মুক্তিযোদ্ধা ওমর কোরাইশীর সাথে। সেই নতুন পথে যদিও বাধা ছিল না। তবুও ঘর-সংসার-সন-ান-লেখাপড়া তার সাথে লেখালিখি। বেশ কষ্ট হয়েছে। তবুও আনন্দের সঙ্গে চাকরিও নিয়েছি বিমান বাংলাদেশ এয়ার লাইসেন্স বিভাগে। তখন চাকরির জন্য চট্টগ্রামেই থেকেছি। আমার স্বামীর ব্যবসার কাজে সুবিধার জন্য চট্টগ্রামে প্রায়ই থেকেছি। সব কিছু মিলিয়ে একেবারে নাকাল অবস'া। তাই কিছুকাল বিরতি আমার লেখালিখির। শুরু হয় তিনটা পুত্রসন-ানকে বড় করার যুদ্ধ। স্বামী ব্যবসায়ী কখনও দেশের বাইরে কখনও দেশেই অবস'ান এক এক সময় এক এক জায়গায়। চাকরিতে আমি বিদেশ বা স্বদেশ কোথায়ও স্পোর্টিং-এ যাইনি শুধু সন-ানদের কারণে।

এভাবেই চাকরি জীবনের ২৭ বছর পার করেছি। কমার্শিয়াল কর্মকর্তা হিসেবে ২৩ বছর চট্টগ্রাম এবং ৪ বছর ঢাকায়। ব্যবসায়ী স্বামী চট্টগ্রামেই তার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান।

কি লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন? মনে যখন যে বিষয় অনুরণন তোলে তাই লেখার চেষ্টা করি। মনে করেন যখন কোন গল্প লিখি তার ফাঁকে ফাঁকে ছড়া লিখতে পছন্দ করি। এর মানেই এই নয় যে ছড়া লিখতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। গল্প, কবিতা, ছড়া, উপন্যাস সবই লেখার চেষ্টা করি। উপন্যাসের উপাত্ত প্রয়োজন, শুধু প্রেম উপজীব্য নয়। প্রেম বিরহ তো আছেই আঞ্চলিক উপাখ্যান, তথ্য-উপাত্তভিত্তিক, সৃষ্টিধর্মী এসবও ভীষণ প্রয়োজন। উপন্যাস বড় ক্যানভাসের বিষয়। তাই সময় নিয়ে লিখবো। একটা উপন্যাস অবশ্য লিখেছি।

আপনার একটা ছড়ার বই এর নাম ‘হৈলুল্লোড়’। এ নাম সম্পর্কে যদি কিছু বলেন ? আমার নাতনির বয়স যখন এক বছর তখন ওর জন্য একটা ছড়ার বই লিখি। বেশির ভাগ ছড়াগুলোই ওর নামে বইটির নাম “হৈলুল্লোড়”। সে এখন সাড়ে চার বছরে। বলে দাদী ঐ বই এর ছড়া সব আমার মুখস-। পড়া শেষ। আরো বই লিখো আমার জন্য। ইচ্ছে আছে আরো লিখার।
আপনার লেখার মধ্যে বারবার মুক্তিযুদ্ধ উঠে আসছে এর কারণ কি? আমি তো একজন মনে-প্রাণে মুক্তিযোদ্ধা। একজন মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী। সেই রাতে মানে ২৫ শে মার্চের রাতে আমার হাতধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল নরপশু পাকিস-ানী সৈন্যরা। আল্লাহ্র অশেষ রহমত বেঁচে গেছি। মিরাকেল ঐ রাতে যে বাড়িতে ওরা গেছে সে বাড়িতে কেউ কি বেঁচেছে? সেই আতঙ্কিত মুহূর্ত আমার পিছু ছাড়েনি বহু বছর। সেই উত্তাল মাচের্র দিন। চারদিকে রাজনীতির লু হাওয়া। আমার নানী বাড়িতে বেড়াতে গেছি। আমার বয়সী আমার ছোটখালা ওর পিড়াপিড়িতে রয়ে গেলাম। ছোটমামা তখন সবুজবাগে থাকতেন। মেজখালা খালু তার ছেলেমেয়ে এ বাড়িতেই। বিকেল থেকে অবস'া ভালো না। রাত যত বাড়ছে থমথম পরিবেশ। খালা বললেন ক্যু হয়ে যাবে। আর্মি নামলে কি হয় বলা যায় না। পুলিশ লাইন পাশেই। তোরা খাটের নিচে চুপ করে থাক। রাত ১২ টার পর থেকে গোলাগুলির আওয়াজ। রাত যত বাড়ছে ততই কাছে আসছে বীভৎস শব্দ। পাশের বড় রাস-ায় ট্যাঙ্কের আওয়াজ, ভারি যানবাহনের আওয়াজ, গোলাগুলির আওয়াজ তীব্র হলো। রঙ্গীন তীব্র আলোর ঝলকানি দরজা জানালার ফাঁক দিয়ে ঠিকরে আসছে। আগুনের পোড়া গন্ধ। পুলিশ লাইন পুড়ছে গোলা বারুদের তীব্র গন্ধ বাতাসে। রাত তিনটা কি সাড়ে তিনটা বাজে। বাইরে আমাদের বিশাল টিনের গেটে বুটের লাথি এবং রাইফেলের বাটের বেদম শব্দ। গেট ভেঙ্গে তারপর ঐ একই ভাবে ঘরের দরজা ভেঙ্গে ওরা ভেতরে। ভাঙ্গা দরজার পাল্লা দিয়ে পাকহানাদার বাহিনীর ৬/৭ জন ভেতরে। মিশক্রিয়েন্ট কাঁহা? মিশক্রিয়েন্ট!
খালাখালু আমরা সবই সামনে দাঁড়িয়ে আয়তুল কুরশি, কালেমা তৈয়ব, সুরা ফাতেহা, সুরা এখলাস সব গড়গড় করে পড়তে লাগলাম। তোদের বিশ্বাস করাতে মরিয়া হয়ে উঠিলাম। আমরা মুসলমান। এদের মধ্যে একজন সিপাহী আমার হাত ধরে হেচকা টান দেয়। আমি ভয়ে চিৎকার করি। খালা হাত জোড় করে প্রাণ ভিক্ষা চায়। বলে আপকা লারকি কা মাফিক। প্লিজ উসকো ছোড় দিয়ে। উসকো ছোড় দিয়ে। কান্নার রোল ঘরময়। কি জানি কি হলো। আল্লাহর রহমতে নাজির হলো ঐ মুহূর্তে ওখানে । ওদের মধ্যে ছিল এই সৈন্যদের কমান্ডার সে বললো, ছোড় দি জিয়ে....
বলে গটগট করে বেড়িয়ে গেলো।
আমি তো কিংকর্তব্যবিমূঢ়! হার্ট বিট উচ্চ মাত্রায় ছিল। খালা বললেন। এখন রাত চারটা বাজে ওরা আবার আসবে। তোদের দুইজন মেয়েকে দেখে গেছে। এর পরে আসলে সোজা ভেতরের দরজা দিয়ে বাগানে চলে যাবি। সেই আতংক কাটেনি। যদি মরে যেতাম, যদি ধরে নিয়ে যেত। কত কিছুই তো হতে পারতো। অনেক কাল কাউকেই বলিনি নিজের মধ্যে নিজেই জ্বলেছি।
মূলত এটাই কারণ।

এছাড়া লেখার মধ্যে আর কোন্ কোন্ বিষয় এসে যায় আপনার? মুক্তিযুদ্ধ ছাড়াও বিভিন্ন বিষয় তো আছেই। মানুষের জীবন, তাদের দু:খ-কষ্ট, অধিকার, নারীর চাওয়া-পাওয়ার ইচ্ছে কত কি তুলে নিয়ে আসি বন্ধ্যা জীবন থেকে উত্তরণ। শুধু নারী কেন, সমাজের অবক্ষয়। এ যুগের ছেলেমেয়েরা যুযোপযোগী হয়ে বেড়ে ওঠা। আলোর নিচে আঁধারকে চিহ্নিত করা। বহুমাত্রিক উপাদান থাকতে হয় লেখায়। আমি যখন ছোটদের জন্য লিখি অর্থাৎ শিশুতোষ তখন আমার মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা শিশুমনটি নড়েচড়ে বসে। ভালোলাগে ওদের জন্য কিছু লিখতে। ছড়ার-ছন্দে কবিতায় সুবাসে গদ্যের বিশ্লেষণে বড় ক্যানভাসে উপন্যাস লেখার ইচ্ছে অবশ্যই আছে।

আমরা জানি আপনার কোন ভাই ছিল না। সেক্ষেত্রে ভাইয়ের অনুপসি'তি অনুভব করতেন ? মা নূরজাহান খান। আমরা ছয় বোন। ছয় বোনই চাকরি করি। কেই ডাক্তার কেউ ইঞ্জিনিয়ার কেউ সরকারি কর্মকর্তা। স্ব স্ব ক্ষেত্রে সবাই
প্রতিষ্ঠিত। ভাই নেই বলে আমাদের বাবা মায়ের কোন দু:খ ছিল না। ছেলেদের মতো করেই তারা আমাদের মানুষ করেছেন। মেয়েরাও বাবা-মাকে সুখের চাদরে জড়িয়ে রেখেছে। ছয় মেয়ের স্বামীরা খুবই ভালো। আমার মা বাবা চাইতেন আমরা লেখাপড়া করে মানুষের মতো মানুষ হয়ে গড়ে উঠি। আমার বাবা খুব শানি- মাটির মানুষ ছিলেন। আমরা মাকে ভয় পেতাম।

এই যে আপনার সাহিত্যচর্চা এতে কার উৎসাহ বেশি ছিল? প্রথমত নিজের মধ্যে কিছু থাকাটাই বেশি প্রয়োজন। সেই ইচ্ছের প্রতিফলন ঘটে লিখনিতে। জীবনের প্রথম শব্দটি মা। ছোটবেলা মায়ের উৎসাহই বেশি প্রয়োজন। মা সবসময়ই বলতেন লেখার অভ্যাসটা যেন না ছাড়ি। আমার আবার সেলাই, রান্না, গাছ-পালা অনেক ধরনের শখই ছিল। মা বলতেন অন্য কিছু কিনতে পাওয়া যাবে কিন' প্রতিভা নিজের ওটাকে লালন করতে হয়। চর্চা করতে হয়। পরবর্তীতে স্বামী সব ব্যাপারেই উৎসাহিত করতেন। লেখালেখি, চাকরি, সেলাই, রান্না আমাকে একজন বায়োনিক ওম্যান হিসেবেই চাইতেন। সব ব্যাপারেই আমি সবার ওপরে থাকি। কিন' তা কি সম্ভব। নিজের সীমাবদ্ধতাও তো আছে।

আপনার বই এর সংখ্যা কত? এ যাবৎ মাত্র ১৮টি বই আমার বেরিয়েছে। শিশুতোষ বই, ছড়া আমার খেলার সাথী, টুপুর টাপুর মিষ্টি দুপুর, হৈলুল্লোড়, ছড়ার বনে হারিয়ে যাবো কিশোর গল্পের বই, বামন মামা, পল্টুর কাঁঠাল চুরি গল্প গ্রন', হলদে পাতার গুঞ্জন, অমানিশার আগুন, কুয়াশার দেওয়ালে যে সূর্য, উপন্যাস, যে জলে চন্দন ঘ্রাণ কাব্যগ্রন', খোলা চিঠি, তখন এখন, হঠাৎ তোমাকে দেখা, ফিরে কি আসা যায়, দিনের পরে বেঁধেছি নূপুর।

আপনার চাকরি জীবন কেমন কেটেছে? এয়ার লাইন্স এর জব চার্মিং জব। সুযোগ-সুবিধা এবং স্যালারি সবই ভালো। বিশেষ করে দেশ ভ্রমণের সুবিধা। ফ্রি টিকেটে অনেক দেশ ঘুরেছি। লন্ডন, আমেরিকা, নেপাল, মালয়েশিয়া, হংকং, ব্যাঙ্কক, সিঙ্গাপুর, দুবাই, সৌদি আরব, ভারতের বিভিন্ন স'ানে।

আপনার শৈশব সম্পর্কে অথবা বেড়ে ওঠার গল্পটা যদি বলেন? পিছনে ফিরে তাকাতে ভালোলাগে। হাতছানিতে ডাকে বর্ণীল সেই শৈশব। বলে আয় ফিরে আয় কাঁচা-মিঠে স্বাদে। সত্যি ছিল মধুর সেই ছোট বেলা। ভাবুক মন তখন থেকেই ভাবনার দোল খেতো। চুরি করে কাঁঠালের মোচা মরিচ-বাটা-লবনের যৌথস্বাদে কী যে উপভোগ্য ছিল! যদিও শহরেই মানুষ হই তবুও পেয়েছি গ্রাম বাংলার স্বাদ।
জন্ম নানার বাড়ি শানি-নগরে। ১৯৫৪ সালের ১৪ই নভেম্বর। বাবা রেলওয়ের কর্মকর্তা ছিলেন। ফলে ঢাকার বাইরেও কাটাতে হয় কিছুু সময়। কিন' লেখার শৈশব-কৈশোর বেড়ে ওঠা ঢাকাতেই। শানি-নগরের তেঁতুলতলার বাড়িতে শৈশব কেটেছে। তারপর বাবা বাড়ি করে এলেন সবুজ বাগ বৌদ্ধ মন্দিরের পাশে। সেই বাষট্টির কথা। তখন ঐ দিকটা কে গ্রামই বলা চলে। সন্ধ্যা হলেই শেয়াল ডাকতো পাশেই পুকুর, ডোবা এবং বিশাল ঝিল ছিল। বুড়িগঙ্গার পানিতে ভরে থাকতো। কত যে সাঁতার কেটেছি ঐ জলে, নৌকায় বেড়িয়েছি। পুকুরে মাছ ধরেছি। আজ আর ঐদিন কোথায়? ধান ক্ষেতগুলোর জায়গা জুড়ে এপার্টমেন্টের দৌরাত্ম্য।
আগের দিনে প্রতিটি বাড়িতে ফুল ফলের বাগান ছিল। আমাদেরও ছিল শেগুন, মেহেগনি, বকুল, কদম, শেফালি, হাসনাহেনা, গোলাপ, বেলী, পেয়ারু, আম, জাম--নিজের হাতে মায়ের সাথে আমরা সব বোনেরা কাজ করেছি। গাছের শখ এখনও রক্তে নেশা জাগায়। বাধ্য হয়ে আমাদের গাছ কাটতে হয়েছে। জীবনের প্রয়োজনে। বাসস'ানের
প্রয়োজনে। এপার্টমেন্ট তৈরি করেছি আমরাও। আমরা ভীষণ কষ্ট পেয়েছি। আমার মা আরো বেশি। এই টুকু সান-্বনা মা তার সেগুন গাছটির একটি পালঙ্ক তৈরি করেছেন। ওটাতেই মা ঘুমান।

জীবনকে কিভাবে দেখেন? জীবনে চড়াই উৎরাই তো আছেই। সেই বাঁকগুলো সার্থকভাবে চলতে পেরেছি । অল্পে ভেঙ্গে পড়িনি কখনও। সোনা পুড়ে খাঁটি হয়, সম্পর্ক পুড়ে রয়ে যায় কিছু ব্যথা। তবুও ওতে সুখ আছে। জীবন কঠিন পাথুরে রাস-া পথ কেটে কেটে নিজেই তৈরি করেছে পথ। এতে আনন্দ অনেক বেশি। যতটুকু অর্জন নিজেদের ঘামে, শ্রমে। কেউ হাতে তুলে দেয়নি কিছু।

আপনি বলেছিলেন আপনার স্বামী একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমার স্বামী একজন মুক্তিযোদ্ধা। দুই নম্বর সেক্টরের খালেদ মোশারফের আন্ডারে ছিলেন। ওর বন্ধু মানিক মুক্তযুদ্ধে শহীদ হয়েছে। যখন ওরা মেলঘর ক্যাম্পে ছিল তখন বেশ মন খারাপ করতো বেশির ভাগ ছেলেরাই। মানিক ভাইকে ও ক্ষেপাতো কি মা মা করিস! মায়ের জন্য কাঁদিস। আমি তো মা কাকে বলে কিছুই বুঝি না। ওর চার বছর বয়সে মা মারা গেছে ১২ বছরে বাবা। ওমর কোরাইশী এখনও একটা সবুজ মনের মানুষ।

কোথায়ও অপূর্ণতা আছে কি? জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতে উৎরে গেছি। তিন ছেলেকে মানুষ করতে পেরেছি। বড় দুটোকে বিয়ে করিয়েছি। একটা নাতি আছে সাড়ে চার বছরের। বড় ছেলে ওর বাবার সাথে ব্যবসা শিখে গেছে। দ্বিতীয় ছেলে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে আছে। তৃতীয়টা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে।
অপূর্ণতা একটু তো আছেই। যতটুকু লেখকসত্তার বিকাশ ঘটার কথা ছিল ততটা হয়নি। ইচ্ছে তো আকাশ ছোঁয়ার। নিজের অবস'ান দৃঢ় করার। অতৃপ্ত মন আমাকে করেছে কাঙালি। চেষ্টা করে যাবো কিছু ভালো লেখা লিখবার। সময়ের সাথে পাল্লায় হেরে গেছি। ৬০/৭০টি বই হয়নি ঠিকই কিন' চেষ্টা করবো ভালো লেখার।

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

Tuesday, April 6, 2010

কাজীর গাঁ-তে কয়েক ঘন্টা, কাজী জহিরের সাথে একদিন



কাজীর গাঁ-তে কয়েক ঘন্টা, কাজী জহিরের সাথে একদিন
এবং প্রথম আলোর ইকবালের বিয়ে প্রসঙ্গ


বুধবার, ২৪ মার্চ ২০১০। শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেটের পেছনে চায়ের দোকানে রেডিও তেহরানের সাংবাদিক এমএম বাদশাহ’র সাথে চা খাচ্ছিলাম। তখন ঘড়িতে বাজে সন্ধ্যা পৌনে আট। হঠাৎ আমার সেল ফোনে ক্রিং ক্রিং শব্দ। প্যান্টের পকেট থেকে সেল ফোন টা বের করে স্ক্রীনে দেখি এক অপরিচিত গ্রামীণ নাম্বার। রিসিভ করতেই কানে ভেসে আসল, আপনি সাইফ বলছেন? আমি ইয়েস বলতেই উনি বলল, আমি কাজী জহিরুল ইসলাম বলছি। ও আল্লাহ! আমার মনে তখন একশত ষাট ডিগ্রি হার্টবিট বেড়ে গেছে। উনি আমাকে ফোন !!!। অবশ্য লন্ডন থেকে মুক্তি আপু ফেসবুকে আমাকে জানিয়েছিল, জহির দেশে যাচ্ছে এক সপ্তাহের ছুটিতে। যাই হোক দেড় মিনিটে কথোপকথনে উনি বলল, আমি গত সোমবার এসেছি, আগামী সোমবার চলে যাবো। শুক্রবার সকালে আমার বাসায় আসবেন। ফোন করে ঠিকানা জেনে নিবেন।

বৃহস্পতিবার, ২৫ মার্চ ২০১০। সকালে অফিসে এসে ফোন দিলাম জহির ভাইকে। তাঁর বাসার ঠিকানা দিলেন, বললেন, আগামীকাল [২৬ মার্চ ] শুক্রবার, সাইফ আপনি যদি ফ্রী থাকেন, চলেন ঘুরে আসি গাজীপুর। যাকে কোনদিন দেখিনি, শুধু অনলাইনে কথা হতো, চ্যাট হতো, অনলাইনেই তাঁর কাছ থেকে পত্রিকার জন্য লেখা নিয়েছি, তাঁর এমন প্রস্তাবে রাজী না হয়ে পারলাম না। অবশ্য আমিও গত কোরবানী ঈদের পর কোথাও যেতে পারিনি অফিস-পড়াশুনা-লেখালেখি প্রচণ্ড যান্ত্রিক জীবন আমার। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, কাজি জহিরুল ইসলাম জাতিসংঘের আর্ন্তজাতিক কর্মকর্তা হলেও মূলত একজন কবি, কথাশিল্পী। বিশ্ব ভ্রমণের উপর লিখে চলেছেন নানা বর্ণিল সব গদ্যরচনা। ইতিমধ্যেই তাঁর ২৫টিরও বেশি গ্রন্থ বেরিয়েছে। দেশ বিদেশের বিভিন্ন জার্নালে লিখছেন অনবরত।


শুক্রবার, ২৬ মার্চ ২০১০। সকালে ঘুম থেকে ওঠে ফ্রেশ হয়ে ছুটলাম গুলশান নিকেতনের উদ্দেশ্যে। আমি সময়ের ব্যাপারে খুবই সিরিয়াস। উনি আমাকে সময় দিয়েছিল সকাল ১০টা। মীরপুর থেকে আমি ৯.৫২ মিনিটে গুলশানে উনার বাড়ীর গেটে গিয়ে ফোন করি। ফ্যাট বাড়ী। সুন্দর সাজানো সিড়ি। লিফটে চলে গেলাম চারতলায়। কলিং বেল টিপটেই জহির ভাই হাসিমুখে দরজা খুলে বলে, ওহ! সাইফ, আসেন। ড্রইং রুমে ঢুকেই দেখি দুইজন সাংবাদিক। বাংলাদেশ প্রতিদিন থেকে এসেছে সাাৎকার নিতে। দীর্ঘ সাাৎকার নিতে সাংবাদিকের উপর আমারই প্রচণ্ড মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছিল।

এরই মধ্যে চলে আসল অবনী অনার্য। কবি ও নির্মাতা অবনী সমপ্রতি একটি মুভি তৈরি করছেন। অবনীর সাথে কথা বলতে বলতে সাাৎকার পর্ব শেষ করে সাংবাদিকরা চলে গেল। এর পর শুরু হল আমাদের আয়োজন। দেরী না করে চকলেট খেতে খেতে জহির ভাই, অবনী এবং আমি বের হলাম গাজীপুরের উদ্দেশ্যে।

আমরা যাচ্ছি। ছোট একটি প্রাইভেট কারে জহির ভাই সামনে সিটে। অবনী আর আমি পেছনের সিটে বসে গল্প করছি। সাঁ সাঁ করে গাড়ি এয়ারপোর্ট আতিক্রম করল। স্বাধীনতা দিবস থাকায় রাস্তায় খুব একটা যানজট নেই। গল্প হচ্ছে। বিশ্ব পরিস্থিতি, জহির ভাইয়ের দীর্ঘ বিদেশে থাকার নানা অভিজ্ঞতা, জাতিসংঘে কর্মররত জহির ভাইয়ের বিভিন্ন স্মৃতি এবং আমাদের ব্যাক্তিগত প্রসঙ্গ। আবহাওয়া খুবই চমৎকার। গরম খুব একটা নেই। আমরা যাচ্ছি। বেলা ১২ টায় পৌঁছে গেলাম গাজীপর শ্রীপুর টেপির বাড়ী। পাশেই কাজীর গাঁ।

আমরা ঢুকে গেলাম কাজীর গাঁ-তে। সাড়ে চার বিঘা জমির চারপাশে সুসজ্জিত ইটের তৈরি বাউন্ডারি দিয়ে ঘেরা। ভেতরে আম, জাম, কাঠাল, লিচু, নারিকেল, জলপাই, কলা, পেঁপে, জামরুলসহ রকমারি ফল ও ফুলের গাছ-গাছালিতে ভরা। প্রকৃতির নির্মল সব আয়োজন এখানে আছে। আছে কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিল্পীদের জন্য একটা ঘর।

ঘরটার উপরে ছনের চাল। আমাদের আঞ্চলিক ভাষা চাল। চাল এর ভালো বাংলা হল ছাদ । মেঝেটা পাকা করা। চারপাশ খোলা । শুনলাম এই ঘরে নাকি মাঝে মাঝে ঢাকা থেকে নাটকের শুটিং এর জন্য বিভিন্ন নাট্যদল ছুটে আসে। তো আমরা কিছুটা সময় কাজীর গাঁ-তে এসব প্রকৃতির সাথে থাকতে থাকতে ২টা বেজে গেল। ঔ ঘরটাতে খাবার এর আয়োজন হল। ভাত, পাট শাক, ইলিশ মাছ ভাজি, মুগীর মাংস, গরু মাংসের ভোনা, দুধ, ইত্যাতি বিশাল আয়োজন। আমরা তিনজনসহ ওখানকার কয়েকজন খেলাম খুবই মজা করে। কাজীর গাঁ-বাড়ীটার কেয়ারটেকার মামার স্ত্রী অসাধারণ রান্না করেছিল।

খাওয়া দাওয়া সেরে আরো কিছুটা সময় ঘুরে দেখলাম। হঠাৎ চোখে পড়ল একটা পেঁপে গাছে পেকে আছে পেঁপে। মামী পেঁপেটাকে গাছ থেকে পেরে জহির ভাইয়ার জন্য ব্যাগে দিয়ে দিল। সময় তখন বিকেল পৌনে চারটা। মন চাইছিলনা ওখান থেকে ঢাকায় আসতে। কিন্তুু যেতে যাহি নাহি চায়-তবু যেতে হয়-এই অমোঘ সত্যকে ভেবে আমরা বিদায় নিলাম এই কাজীর গাঁ থেকে।


ফিরতে ফিরতে ঢাকায় তখন সন্ধ্যা। জহির ভাই বলল, চলেন, আমি একা, ইকবালের বিয়েটা খেয়ে আসি। ইকবাল হোসাইন চৌধুরী বর্তমানে প্রথম আলোতে কর্মরত। উইকলি সাপ্লিম্যানট ছুটির দিন দেখেন। প্রথম আলোরই আরেকটা উইকলি সাপ্লিম্যানট নকশার সামার সাথে বিয়ে। আমরা চলে গেলাম ধানমণ্ডির ফর সিজন রেস্টুরেন্টে। বিয়ের অনুষ্ঠান সেরে রাত ১০টায় জহির ভাইকে বিদায় দিয়ে ফিরলাম বাসায়। অনেকদিন পর পরিতৃপ্তির একটা দিন কাটালাম।

Saturday, March 27, 2010

সম্ভাবনার বাংলাদেশ [৭ম কিস্তি ]


সম্ভাবনার বাংলাদেশ [৭ম কিস্তি ]

[সুজলা সুফলা শষ্য শ্যামল আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। এ দেশে রয়েছে অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ। এ সম্পদ সঠিক ভাবে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক সমৃদ্ধশালী দেশ। এসব সম্ভাবনার কথা নিয়ে এই বিশেষ রচনাটি আরটিএনএন এর পাঠকদের জন্য ধারাবাহিকভাবে লিখছেন সাইফ বরকতুল্লাহ । আজ প্রকাশিত হল এর ৭ম কিস্তি।]


১. দেশে ৪০ লাখ মিনি ডেইরি ফার্ম গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে

বাংলাদেশের ডেইরি খাতের ব্যাপক সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশে প্রায় ৪০ লাখ মিনি ডেইরি ফার্ম গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। আর এ সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে পারলে এর মাধ্যমে দুধ, সার ও বায়োগ্যাস উৎপাদন এবং এগুলো রক্ষণাবেক্ষণ, পরিবহনসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রায় সোয়া কোটি লোকের কর্মসংস্থান হবে।

গভর্নর বলেন, ¯^‡`wk উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নের জন্যই এ বায়োগ্যাস প্লান্ট চালু করা হচ্ছে। দেশের জনসংখ্যা ১৫ কোটি হলেও মানুষ আগের চেয়ে অনেক ভালো রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কর্মক্ষম সব মানুষ কাজ করছে। দেশে অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য নতুন যুদ্ধ চলছে।

গবেষণার ফলাফল উদ্ধৃত করে তিনি জানান, বাংলাদেশে ৪০ লাখ ক্ষুদ্র ডেইরি ফার্মের সম্ভাবনা রয়েছে। যা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে প্রায় ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন কিউবিক মিটার বায়োগ্যাস, ২৪০ মিলিয়ন টন প্রাকৃতিক সার, ৫ মিলিয়ন টন ভার্মি কম্পোস্ট, ১৭ বিলিয়ন লিটার দুধ, প্রতি ১৪ মাসে ১৬ মিলিয়ন বাছুর, ১ মিলিয়ন টন মাংস এবং ২৬ মিলিয়ন বর্গমিটার চামড়া এবং ৩ লাখ টন হাড় পাওয়া যাবে।

গভর্নর বলেন, এ ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হলে প্রচুর পরিমাণে দুধ, সার ও বায়োগ্যাস উৎপাদন এবং এ খাতের রক্ষণাবেক্ষণ, পরিবহনসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে ১ কোটি ২০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।


২. সম্ভাবনাময় সমুদ্র সৈকত সোনারচর
সম্ভাবনাময় সমুদ্র সৈকত পটুয়াখালীর গলাচিপার সোনারচর হতে পারে পর্যটকদের জন্য তীর্থস্থান। দীর্ঘ এ সমুদ্র সৈকতের যে কোনো জায়গায় দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয় দেখা যায়। সেই সঙ্গে বাড়তি আনন্দ দেয় জেলেদের নৌকায় জাল ফেলে মাছ ধরার দৃশ্য।
বনাঞ্চলের দিকে তাকালে সহজেই দেখা যাবে বুনোমোষ। ভাগ্য সহায় হলে দেখা হয়ে যেতে পারে হরিণপালের সঙ্গে। এখানে আরো দেখা যাবে বন্য শূকর, বানর, মেছো বাঘসহ নানা ধরনের বন্যপ্রাণী। দেখা যাবে সমুদ্রগামী হাজারো জেলের জীবন সংগ্রামের দৃশ্য। সোনারচরে সোনা নেই তবে আছে সোনা রঙের বালি। বিশেষ করে শেষ বিকালের সূর্যের আলো যখন সোনারচরের বেলাভূমিতে পড়ে, তখন দূর থেকে মনে হয় পুরো দ্বীপটি যেন একটি সোনার থালা। কাঁচা সোনা লেপ্টে দেয়া হয়েছে এ দ্বীপটিতে।

এলাকাবাসীর ধারণা উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যের কারণেই এর নামকরণ করা হয়েছে সোনারচর। মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের চাদরে ঢাকা এ দ্বীপটিতে নদী আর সাগরের জল আছড়ে পড়ে। অপরূপ সোনারচর ¯^Y©vjx ¯^‡cœi মতোই বর্ণিল শোভায় ঘেরা। প্রায় ১০ হাজার একর এলাকাজুড়ে ¯^gwngvq প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিলিয়ে যাচ্ছে এ দ্বীপটি। এখানে রয়েছে পাখ-পাখালির কলকাকলিতে মুখরিত বিশাল বনানী। যা শীতের সময় পরিণত হয় বিভিন্ন প্রকার অতিথি পাখির অভয়ারণ্যে।

সৌন্দর্য পিপাসু পর্যটকরা এখানে এলে সোনারচরের মনমোহনীয়রূপ তাদের মুগ্ধ করবেই। ১৯৫০-এর দশকে গলাচিপা উপজেলার সর্ব দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে জেগে ওঠে সোনারচর। পর্যায়ক্রমে চরটি পরিপূর্ণতা লাভ করলে ১৯৭৪ সালে স্থানীয় বন বিভাগ বিভিন্ন ম্যানগ্রোভ জাতের গাছের বাগান গড়ে তোলে এবং এরপরই বন বিভাগ তৈরি করে একটি ক্যাম্প ও গলাচিপা উপজেলা প্রশাসন পর্যটকদের সুযোগ-সুবিধার জন্য গড়ে তোলে একটি বাংলো। গলাচিপা উপজেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার দক্ষিণে পানপট্টি লঞ্চঘাট। সেখান থেকে ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে আগুনমুখা নদী পেরিয়ে ডিগ্রি নদীর বুকচিরে কিছুদূর এগোলেই বুড়াগৌরাঙ্গ নদী। সামনে গিয়ে বায়ে ঘুরতেই দাঁড় ছেঁড়া নদীর দু’পাশে দাঁড়ানো সারি সারি ঘন ম্যানগ্রোভ গাছের বাগান। নদীর বুকজুড়ে গাঙ শালিকের অবাধ বিচরণ। সামুদ্রিক হাওয়ার মৃদুছোঁয়া সব মিলিয়ে অন্যরকম এক রোমাঞ্চকর ভালো লাগার অনুভূতি। এভাবে ঘণ্টা তিনেক এগোলেই চোখে পড়বে প্রকৃতির অনন্য সৌন্দর্যমণ্ডিত সববয়সী মানুষের হৃদয় হরণকারী মায়াবী দ্বীপচর তাপসী আর এ থেকে সর্বোচ্চ আধা ঘণ্টা সামনে এগোলেই প্রতীক্ষিত সোনারচরের দেখা মিলবে।
এছাড়া প্রকৃতির হাতেগড়া চরমৌডুবি, জাহাজমারা, চরতুফানিয়া, চরফরিদ ও শিপচরসহ বেশকিছু দ্বীপের সৌন্দর্য উপভোগ করার মতো। দ্বীপগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণ করে এবং পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলা সেই সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি করতে পারলে দেশের পর্যটন শিল্পে নতুন মাত্রা যোগ হবে বলে এলাকাবাসী মনে করছেন।

৩. আখের ছোবড়া থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন

দেশের চিনিকলগুলোতে চিনির পাশাপাশি আখের ছোবড়া থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চিন্তাভাবনা করছে সরকার। এ লক্ষে চিনিকলগুলোতে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। গত রোববার শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া শিল্প ভবনে চিনি শিল্প করপোরেশনসহ সংশি¬ষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান। দিলীপ বড়ুয়া জানান, চিনিকলগুলো দ্বৈত (চিনি ও বিদ্যুৎ) উৎপাদন ক্ষমতার সরঞ্জামাদি স্থাপনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ জন্য সম্ভাব্যতা যাচাই ও সমীক্ষা করতে বলা হয়েছে, যাতে আখের অবশিষ্টাংশ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। মন্ত্রী বলেন, চিনিকলগুলোকে লাভজনক করতে পরিত্যক্ত তরল পদার্থ (চিটা গুড়) ব্যবহার করে মদ উৎপাদনের চিন্তাভাবনাও করছে সরকার। ডিস্টিলারি প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য কয়েকটি চিনিকলকে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্তত দুটি কারখানাকে এ জন্য চূড়ান্ত করা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, দেশে বর্তমানে চিনির চাহিদা প্রায় ১২ লাখ টন। কিন্তু দেশীয়ভাবে এ বছর চিনির উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৬০ হাজার টন। বাকি পুরোটাই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। চিনি শিল্প করপোরেশনকে এ জন্য আন্তর্জাতিক বাজার যাচাই করে মূল্য নির্ধারণ এবং দ্রুত চিনি আমদানির নির্দেশ দেয়া হয়েছে। শিগগিরই সব প্রক্রিয়া শেষে চিনি আমদানি করা হবে।

৪. বৈদেশিক আয়ের উৎস হতে পারে সুন্দরবনের কাঁকড়া

সুন্দরবনের প্রাকৃতিক উৎস থেকে সংগৃহীত কাঁকড়া বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সুন্দরবনের কাঁকড়া আহরণকারীদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, আধুনিক পদ্বতি ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারলে প্রতি বছর এ খাত থেকে কয়েক শ’ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। প্রতি বছর আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁকড়ার চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি দামও বাড়ছে।

আষাঢ় মাস থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত কাঁকড়া আহরণ মওসুম সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার সহস্রাধিক জেলে বন বিভগ থেকে নির্দিষ্ট ivR‡¯^i বিনিময়ে পারমিট সংগ্রহ করে সুন্দরবনে প্রবেশ করে। গহীন সুন্দরবনসহ সাগর মোহনা থেকে জেলেরা কাঁকড়া আহরণ করে। এছাড়া উপকূলীয় জেলা খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার দেড় লক্ষাধিক হেক্টর চিংড়ি ঘেরে প্রাকৃতিকভাবেই কাঁকড়া উৎপন্ন হয়।

মৎস্য বিভাগ জানিয়েছে, সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় ১১ প্রজাতির কাঁকড়া পাওয়া যায়। এর মধ্যে মাইলা, হাব্বা, সিলা ও সেটরা কাঁকড়ার প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন থাকায় চীন, মিয়ানমার, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান, হংকংসহ বিভিন্ন দেশে কাঁকড়ার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো- ৬ সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৭-৭৮ অর্থবছরে বিদেশে প্রথম কাঁকড়া রপ্তানি শুরু হয়। এরপর প্রায় তিন বছর বন্ধ থাকার পর ১৯৮২-৮৩ অর্থবছরে আবার বিদেশে কাঁকড়া রপ্তানি শুরু হয়। পর্যায়ক্রমে বিশ্ববাজারে এর চাহিদা বাড়তে থাকে। পাশাপাশি বাড়তে থাকে এ খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রার আয়। ১৯৯০-৯১ সালে কাঁকড়া রপ্তানি করে আয় হয় ২৭ লাখ ৯৩ হাজার টাকা।

১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে রপ্তানি আয় কয়েকগুন বেড়ে যায়। ওই অর্থবছরে ২৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকার কাঁকড়া রপ্তানি করা হয়। ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে রপ্তানি হয় ১২৫ কোটি ২২ লাখ ৩৯ হাজার টাকার, ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে কাঁকড়া রপ্তানি করা হয় ১৪১ কোটি ৬৬ লাখ ৬ হাজার টাকার। ২০০১-০২ অর্থবছরে এ খাত থেকে আয় হয় ৫৩০ কোটি টাকা। ২০০২-০৩ অর্থবছরে কাঁকড়া রপ্তানি হয়েছে ২ দশমিক ৫২ মিলিয়ন ডলারের ৬৩০ মেট্রিক টন।

২০০৩-০৪ অর্থবছরে এ খাতে আয় গিয়ে দাঁড়ায় ১৪৬ মিলিয়ন টাকায়। কাঁকড়া চাষি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সুন্দরবন সংলগ্ন সাগর ও নদীগুলোতে যে পরিমাণ কাঁকড়া ধরা পড়ে তা প্রাকৃতিকভাবে রেণু থেকে বড় হয়। এ অঞ্চলে ১২ মাস কাঁকড়ার চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকায় এখন অনেক কাঁকড়া চাষে আগ্রহী হচ্ছে। তাছাড়া চিংড়ি চাষের জন্য প্রচুর জমি ও অর্থের প্রয়োজন হলেও কাঁকড়া চাষের জন্য জমি ও অর্থ দুটোই কম লাগে।

সুন্দরবনে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত প্রচুর পরিমাণে যে কাঁকড়া ধরা পড়ে তা সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানি, কাঁকড়া চাষিদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও সরকারিভাবে ব্যাংকঋণের সুবিধা দেয়া হলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে কাঁকড়া রপ্তানি দেশের সমৃদ্ধির দুয়ার উন্মোচন করতে পারবে। [ চলবে...]




তথ্যসূত্র : ১. বিবিসি নিউজ ২. আরটিএনএন ৩.দৈনিক ভোরের কাগজ ৪. দৈনিক যায়যায়দিন