Pages

Saturday, July 25, 2009

বর্ষার রাত এবং আমি


বিভাগ ঃ কবিতা

বর্ষার রাত এবং আমি
সাইফ বরকতুল্লাহ

বর্ষার রাত এবং আমি
বিছানায় শুয়েছি নিঃশব্দ রাত
কখনো কখনো পাখিদের কিচিরমিচির
নরম ছায়ায় আমার দুচোখ ঘুম আসেনা
বাইরে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি বর্ষার ছবি এঁকে যায়

আমি অবিরাম শুয়ে আছি
যতবার ঘুমোতে চোখ বুজো দেই
অথচ দুচোখ অবিরাম কান্নায় নীরব
শোকাচ্ছন্ন স্মৃতিময় অর্ন্তলোকে কষ্টময় বাতাবরণ
নিঃশব্দের মধ্যরাতে আমি শুধুই চেয়ে আছি
জ্যোর্তিময় আলোর অপেক্ষায়।

Saturday, July 18, 2009

dream


আমার dream কেন
এমন dream হয়
এই মনটা কেন
বারে বারে ভেঙ্গে যায়
আমার কবিতাগুলো
প্রতিদিন ছন্দ হারায় ????

Wednesday, July 15, 2009

Friday, July 3, 2009

মাহমুদ আহমাদিনেজাদঃ টুইটার রেভলিউশন এবং বিশ্বরাজনীতির নতুন ঢেউ


ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানে গত ১২ জুন শান্তিপূর্ণভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ঐ নির্বাচনে ড· আহমাদিনেজাদ এক কোটি দশ লক্ষাধিক ভোট বেশি পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছে। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দী প্রার্থী মীর হুসেইন মুসাভি পেয়েছেন মোট বত্রিশ লাখ ভোট। অপর দুই প্রার্থী একজন ৩ শতাংশ এবং আরেকজন ১ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী মুসাভি ও তার সমর্থকরা নির্বাচনী ফল মেনে নেননি। শুধু তাই নয় নতুন নির্বাচনের দাবী জানিয়েছেন তারা। তারা রাজধানী তেহরানে ব্যাপক বিক্ষোভ, অগ্নিসয়যোগ, লুটপাট ও সহিংসতা চালিয়েছেন । ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন মারাও গেছেন । পাশ্চাত্যের মিডিয়াগুলোও মুসাভির দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন । নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, সিএনএন, আমেরিকার ইহুদি সংগঠনগুলো এবং ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একযোগে মুসাভির পুননির্বাচনের দাবির প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে। মুসাভির সহিংস আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ইরানের সব্বোর্চ ধর্মীয় নেতা ইমাম আয়াতুল্লাহ খামেনী গত ১৯ জুন শুক্রবার তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে জুমার নামাজে এক ব্যতিক্রমী ভাষণে বলেছেন , জনগণ তাকেই নির্বাচিত করেছে যাকে তারা চায় । তিনি আরো বলেছেন, আহমাদিনেজাদের পুনঃনির্বাচনের ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই । ১ কোটি ১০ লাখ ভোটের বিষয়টি কিভাবে কারচুপি করা যায় । তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেন,নির্বাচনে কোন কারচুপি হয়নি। তিনি আন্দোলনকারীদের প্রতি হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন,এরপর কোন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে তার দায় বিরোধীদের নিতে হবে।
দুই
ইরানের সামপ্রতিক ভোট গ্রহণের আগে দেশটির নির্বাচনী ফলাফলের উপর জরিপ চালায় বেশ কিছু পশ্চিমা গণমাধ্যম। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাবিদার যুক্তরাষ্ট্রের টেরর ফ্রি টুমরো, ওয়াশিংটন পোস্ট ও ব্রিটিশ পত্রিকা টাইমস । সব জরিপের ফল ছিল কাছাকাছি। টেরর ফ্রি টুমরো ও ওয়াশিংটন পোস্ট-এর জরিপে বলা হয় , মাহমুদ আহমাদিনেজাদ ২:১ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হবেন। টাইমস পত্রিকাও আহমাদিনেজাদের বিজয়ের ব্যাপারে ভবিষ্যদ্বাণী করেন। ইরানের এবারের নির্বাচন নানা কারণেই ছিল পশ্চিমা বিশ্বের আলোচনার বিষয়বস্তু।
বিশেষ করে ইহুদি নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া এ নির্বাচন নিয়ে ছিল অসম্ভব রকম তৎপর। কারণ দেশটির পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনে অনেকদূর এগিয়ে যাবে, নাকি ইহুদি-খ্রিস্টানবলয়ের ইচ্ছা পূরণ করে এখানেই ক্ষান্ত দেবে পথ চলা-এ প্রশ্নের উপর অনেকটা নির্ভর করছে নির্বাচনের ফলাফলের উপর। ফলে পশ্চিমা মিডিয়া যেমন আহমাদিনেজাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় । আবার অন্যদিকে মুসাভিকে বর্হিবিশ্বে তুলে ধরা হয় জনপ্রিয়, সংস্কারপন্থী হিসেবে। এ প্রচারণার গুণে বহির্বিশ্বে একটি উজ্জল ভাব মর্যাদা তৈরি হয় মুসাভির । মুসাভির সমর্থকরাও প্রায় ক্ষমতায় চলে গেছেন এমন স্বপ্ন দেখা শুরু করেন। কিন্তু নির্বাচনী ফল ঘোষণার পর সে স্বপ্ন ভেঙ্গে গেলে অনেকটা হতাশা ও ক্ষোভ থেকে রাস্তায় নেমে আসে তারা ।
তিন
ইরানের নির্বাচনী ঘটনা প্রবাহের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যাবে,ভোট গ্রহণের কাছাকাছি সময় হঠাৎ করেই যেন সরব হয়ে উঠে পশ্চিমা গণমাধ্যম। এ প্রচারণায় মুসাভির গুণগান আর আহমাদিনেজাদের ভুলত্রুটি ফলাও করে প্রচার করা হয় । ব্রিটেনের গার্ডিয়ান পত্রিকার আর্ন্তজাতিক বিশ্লেষক সিউমাস মিলনে সমপ্রতি লিখেছে, পশ্চিমা গণমাধ্যমে তেহরানের তরুণদের বিক্ষোভের দৃশ্য প্রচার করেছে। তাদের চোখে আহমাদিনেজাদ নিতান্তই এক ইহুদি বিদ্বেষী ব্যাক্তিত্ব। কিন্তু আহমাদিনেজাদের অন্যরূপ, যিনি তার দেশের স্বাধীনতার রক্ষক, যিনি টিভি ভাষণে অভিযাত মহলের দূর্নীতি ফাঁস করে দেন এবং যিনি তেল সম্পদ ব্যবহার করে সংখ্যাগরিষ্ট গরিব মানুষের অবস্থার উন্নতির জন্য সচেষ্ট,পশ্চিমা গণমাধ্যমে এই ইরানী প্রেসিডেন্টের ভাব মর্যাদা দেখানো হয়না।
চার
সাবেক প্রেসিডেন্ট মুসাভির আন্দোলনকে অনেক বিশ্লেষক নাম দিয়েছেন টুইটার রেভলিউশন। অর্থøাৎ বাস্তব অবস্থা ভুলে গিয়ে হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলা বা পাখির মতো কিচিরমিচির করা। মুসাভির সমর্থকরা সে পথই বেছে নিয়েছেন।
পাচ
ইরানের এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে বিশ্বব্যাপী নতুন রাজনীতি শুরু হয়েছে। নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকরা মনে ,করেন,সিআইএ এবং ইসরেল দীর্ঘদিনের নীল নকশার আলোকে ইরানে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির সুযোগ করে দিয়েছে । মার্কিন ইলেকট্রনিক মিডিয়া জানাচ্ছে, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ ইরানে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সিআইএকে ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ দিয়েেছল। ২৭ মে ২০০৭ তারিখে লন্ডন ডেইলি টেলিগ্রাফ এক রিপোর্টে জানায় , প্রেসিডেন্ট বুশ ইরানে অস্থিতিশীলতা তৈরির পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে মোল্লাদের শাসনের অবসান ঘটানোর লক্ষে অপপ্রচার চালানোর জন্য এক সরকারি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেেছন। Information clearing house news ওয়েবসাইটের মতে,মুসাভির সমর্থনে যারা বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছে তাদের অনেকেই হয়তো আন্তরিক ,কিন্তু তারা হয়তো বুঝতে পারছেন না যে,এর পেছনে কারা ইন্ধন দিচ্ছে।
ছয়
সামপ্রতিক সময়ে এশিয়ার কয়েকটি দেশে নির্বাচন এবং পশ্চিমা মিডিয়াগুলোর প্রচারণা লক্ষণীয়। নেপালে মাওবাদীদের ক্ষমতায় আসা, ভারতে ৩য় বা ৪র্থ ফ্রন্টের ভরাডুবি, লেবাননে পশ্চিমাপন্থিদের জয় এবং ইরানের আহমাদিনেজাদের বিজয়ে একই চিত্র দেখা গেছে। নিজেদের পছন্দের প্রার্থীর গুণগান গাওয়া ও তাকে বড় করে দেখানের চেষ্টা । সেই সাথে সংশ্লিষ্ট দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট উপেক্ষা করা যেন পশ্চিমা মিডিয়ার মূল বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাত
প্রকৃতপক্ষে ইরানে কী ঘটছে বা কেন ঘটছে? বিশ্ব রাজনীতিতে স্বৈরাচারকে বিপ্লবের মাধ্যমে হটিয়ে দেয়ার ঘটনা বিরল না হলেও পরাশক্তিকে টেক্কা দিয়ে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নেই বললেই চলে। এ ক্ষেত্রে ইরানের ইসলামী বিপ্লব সংগঠন এবং যাতে তার ত্রিশটি বছর টিকে থাকা এক ব্যতিক্রমী ইতিহাস।সামপ্রতিককালে ইরানের পরমাণু প্রকল্প নিয়ে বিতর্ক এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদের বলিষ্ট নেতৃত্ব সারা বিশ্বে তাকে আলোচিত করে তুলেছে। আর এটাই পশ্চিমাদের মাথা ব্যাথা। ইরানের প্রধান শত্রু রাষ্ট্রগুলো যখন ইরানের নির্বাচনোত্তর সহিংসতার উসকানি দিচ্ছে,তখন এটা বুঝতে কারো বাকি নয় যে,তারা উত্তেজনা সৃষ্টির পেছনে আছে কি নেই। মার্কিন বুদ্ধিজীবি মহলে ইরানের নির্বাচন নিয়ে এই নতুন উপলদ্ধি এখন বিশ্লেষকরা। শুধু তাই নয় বিশ্ব রাজনীতিতেও এক নতুন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এবারের ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন।

Wednesday, May 20, 2009

দক্ষিণ এশিয়া মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে!


পৃথিবীজুড়ে এখন এক নতুন অস্থিরতা। যুদ্ধ, বিগ্রহ, নিগ্রহ তো চলছেই, তার ওপর হাজির হয়েছে বিশ্বব্যাপী অর্থনীতির মন্দাদশা।
ইতোমধ্যে ‘আফগানিস্তান’ সেই রণক্ষেত্রের রূপ নিয়েছে। ইউরোপ ও আমেরিকার যুদ্ধরাজনীতি, অস্ত্র অর্থনীতি এখন আফগানিস্তানকে কেন্দ্র করেই। সুতরাং পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভারত, বাংলাদেশ প্রায় সবাই আমরা এই রণক্ষেত্রের আওতাধীন। বড় দেশ ভারত, তার অর্থনীতির জোরেই, রাজনীতির মতায় মার্কিন-ইউরোপের বড় মিত্র বনেছে। তাহলে এই অঞ্চলের ছোট দেশগুলোর কি হবে? এ প্রশ্ন জাগলেই পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপালের বর্তমান চেহারা ভেসে ওঠে। বাংলাদেশও সেই বিবেচনায় বড় ঝুঁকির মুখে।



২·
ওয়ান ইলেভেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রজীবনে এক ঐতিহাসিত ট্র্যাজেডি। দুই রাজনৈতিক দলের অসহিষ্ণুতা ও অবিশ্বাস এবং সরকারি দল ও বিরোধী দলের প্রতিহিংসার রাজনীতি বাংলাদেশকে ১/১১-এর মতো ঘটনার জন্ম দিয়েছিল। রাজনৈতিক শুদ্ধতা আর অবিবেচনা দুই বড় রাজনৈতিক দলকে পরস্পরের মুখে দাঁড় করিয়ে ক্রমাগত বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামোর অংশ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করেছে। কয়েক দশক ধরে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজির মোড়কে বেসামরিক নেতৃত্ব তৈরির সূতিকাগার ছাত্ররাজনীতিকে ধ্বংস করা হয়েছে। পাবলিক সার্ভিস কমিশন পুলিশ প্রশাসন ইত্যাদি অফিসে-আদালতে দলীয়করণ এমনভাবে ঘটেছে যাতে অভ্যন্তরীণ সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য যোগ্য, নিরপে মানুষ সামনের দিনে পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় নানান প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আঘাত হানা হয়েছে রাজনৈতিক দল নামের প্রতিষ্ঠানে। দল ভাঙা, সংস্কারের নামে বিদ্রোহ- একের পর এক ঘটনাচক্রে রাজনৈতিক দলগুলোতে তৈরি হয়েছে অবিশ্বাস আর সন্দেহ। ছাত্র-শিক্ষক সেনাবাহিনী সংঘর্ষ ঘটিয়ে ক্ষেপিয়ে তোলা হয়েছে পরস্পরকে। মিডিয়া এবং সেনাবাহিনীকে প্রতিপ হিসেবে দাঁড় করানোর পুরনো চেষ্টা বারবার ফিরে এসেছে।
৩·
২৬ নভেম্বর ২০০৮ ঘটল মুম্বাই হামলা। সন্ত্রাসীদের তাণ্ডব দেখল গোটা পৃথিবী। উদার গণতান্ত্রিক দেশ ভারত রাজনৈতিক বিবেচনায় সামরিক সমাধানের আওতায় এ হামলার মোকাবেলা করলেও পাকিস্তান ভারতে সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়ে যায় বহুলাংশে।
৪·
এর সমাপ্তি ঘটতে না ঘটতেই শ্রীলঙ্কা জুড়ে হঠাত করেই দ্রুত পতন ঘটতে শুরু করল শক্তিমান তামিল গেরিলাদের।
৫·
এ কৌতূহলের সুরাহা না হতেই আক্রান্ত হলো বাংলাদেশ। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ রক্তাক্ত হলো বাংলাদেশ। কথিত বিডিআর সেনাদের বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে হত্যা এবং পৈশাচিকতার মাধ্যমে যে রক্তক্ষয়, পারস্পারিক অবিশ্বাস আর জিঘাংসার উদ্‌ভব হলো তার খেসারত কতকাল চলবে কে জানে?
৬·
পাকিস্তান মানবিক বিপর্যয়ের মুখেঃ
পাকিস্তানের সোয়াত উপত্যকায় কয়েক লাখ লোক ঘর ছেড়ে পালানোর পর দেশটিতে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছে জাতিসংঘ। শরণার্থী শিবিরগুলোতে আশ্রয় নেওয়া লোকজন প্রচণ্ড গরম ও খাদ্য-পানির অভাবে দুর্বিষহ দিন কাটাচ্ছে। নিজ বাগিঘর ছেড়ে এখন পর্যন্ত প্রায় ছয় লাখ মানুষ শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে।
১০ মে নতুন করে প্রায় এক লাখ লোক সোয়াত ছেড়েছে। শরণার্থীদের থাকা ও খাবারের ব্যবস্থা করার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আবেদন জানিয়েছে পাকিস্তানের মন্ত্রিপরিষদ। গত মাসের শেষ সপ্তাহে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে তালেবান জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। দেশটির প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি বলেছেন, সোয়াত উপত্যকায় অবস্থান করা তিন হাজার তালেবান জঙ্গির সবাইকে হত্যা করা হবে।
৭·
তালেবান দমনে নিরীহ মানুষের মৃত্যু নিয়ে আফগানিস্তানে ক্ষোভ
আফগানিস্তানে তালেবান ও অন্যান্য উগ্রবাদী শক্তির বিরুদ্ধে হামলার সময় সাধারণ নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ও ভোগান্তি বেড়ে চলার ফলে চরম সমস্যায় পড়ছে দেশটির সরকার। ফারাহ প্রদেশে হামলার প্রতিবাদে রোববার কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক শ শিক্ষার্থীমার্কিনবিরোধীশ্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ করেছেন।
আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বে যৌথ বাহিনীর ওপরও চাপ বাড়ছে। সম্প্রতি আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই ও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে যৌথ বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। গত সপ্তাহে আফগানিস্তানের ফারাহ প্রদেশে দুটি গ্রামে মার্কিন বিমান হামলায় প্রায় ১৩০ জন নিরহি মানুষের মৃত্যু হয়। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
৮·
শ্রীলঙ্কায় সেনাবাহিনী গোলাবর্ষণঃ বেসামরিক লোক নিহত
শ্রীলঙ্কায় গত সপ্তাহের শুরুতে সেনাবাহিনীর গোলার আঘাতে অন্তত ৩৭৮ জন বেসামরিক লোকের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া আহত হয়েছে এক হাজার ১২২ জন। রণাঙ্গনের একটি হাসপাতালে কর্তব্যরত একজন সরকারি চিকিঃসক এ দাবি করেছেন।
তবে তামিল গেরিলাদের দাবি, ৯ মে রাত থেকে শুরু হওয়া সেনাবাহিনীর গোলাবর্ষণে দুই হাজার বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে। সেনাবাহিনী এ গোলাবর্ষণের কথা অস্বীকার করেছে।
রণাঙ্গনের একটি সরকারি হাসপাতাল পরিচালনাকারী চিকিঃসক ভি শানমুগারাজা জানান, শনিবার এক রাতের সেনা অভিযানেই এসব হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। তিনি এ ঘটনাকে তামিল গেরিলাবিরোধী সেনা অভিযানের ‘সবচেয়ে রক্তাক্ত’ দিন হিসেবে অভিহিত করেছে।
তিনি বলেন, সেনাবাহিনী যে এলাকায় অবস্থান করেছে সেখান থেকেই এ গোলাবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। গেরিলাদের নিজস্ব ওয়েবসাইট ‘তামিলনেট’ দাবি করেছে, এ অভিযানে প্রায় দুই হাজার নির্দোষ লোক নিহত হয়েছে। তবে নিরপে কোনো সূত্র থেকে এ হতাহতের সংখ্যা নিশ্চিত করা যায়নি। এলাকাটি সাংবাদিকদের জন্য প্রবেশ নিষিদ্ধ। এটি শ্রীলঙ্কা সরকারঘোষিত বেসামরিক নাগরিকদের জন্য নিরাপদ এলাকা।
৯·
নেপালি পার্লামেন্টের অধিবেশন অচল মাওবাদী বিক্ষোভ
রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় সরকার গঠনে সমঝোতায় পৌঁছতে ব্যর্থ হওয়ায় নেপালের প্রেসিডেন্ট রামবরণ যাদব গতকাল পার্লামেন্টকেই নতুন সরকার গঠন করতে বলেছেন। তবে মাওবাদী এমপিদের বিক্ষোভের মুখে পার্লামেন্টের অধিবেশনই বসতে পারছে না। গত রোববারও অধিবেশন মুলতবি করতে বাধ্য হন স্পিকার। মাওবাদী নেতা পুষ্প কমল দহল প্রচণ্ডের পদত্যাগের পর শনিবার পর্যন্ত সময় দিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি সরকার গঠনের জন্য দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট যাদব। কিন্তু তা না হওয়ায় রোববার তিনি নতুন আবেদন রাখেন পার্লামেন্টের কাছে। পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নতুন সরকার গঠনের তাগিদ দেন তিনি।
১০·
যুদ্ধ, সন্ত্রাস আর জঙ্গি হামলায় দণি এশিয়া এখন বিপর্যস্ত। একদিকে শ্রীলঙ্কায় তামিলদের সঙ্গে সরকারি বাহিনী যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক বেসামরিক লোক মারা যাচ্ছে। অন্যদিকে পাকিস্তানে জঙ্গি ও সেনাবাহিনীর সংঘর্ষেও প্রাণ হারাচ্ছে নিরিহ জনতা। আফগানিস্তানে জঙ্গি হামলার পাশাপাশি চলছে যুক্তরাষ্ট্রের বোমাবর্ষণ এবং যথারীতি মারা যাচ্ছে সাধারণ মানুষ । নেপালে সেনাবাহিনীর সঙ্গে নবনির্বাচিত মাওবাদী নেতার দ্বন্দ্বে সদ্য পাওয়া গণতন্ত্রের স্বাদ বিস্বাদ হতে চলেছে। সব মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ বেশ কিছুদিন থেকেই শান্তিতে ঘুমোতে পারছে না। তাই অকপটেই বলা যায় দণি এশিয়া এখন মৃত্যর দিকে ধাবিত হচ্ছে।

Wednesday, May 6, 2009

সম্ভাবনার বাংলাদেশ

সুজলা সুফলা শষ্য শ্যামল আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশ। এ দেশে রয়েছে অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ। এ সম্পদ সঠিক ভাবে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক সমৃদ্ধশালী দেশ। এসব সম্ভাবনার কথা নিয়ে পাঠকদের জন্য এই বিশেষ রচনাটি লিখেছেন সাইফ বরকতুল্লাহ। আজ প্রকাশিত হলো ২য় পর্ব।


১৫·পাথরকুচি থেকে বিদ্যুত
এবার পাথর কুচি থেকে বিদ্যুত।অসাধারণ এক আবিষ্কার।আবিষ্কারক হলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌরশক্তি গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক ড· কামরুল আলম খান।এক একরে পাথরকুচি চাষ করে তা দিয়ে মাত্র ১কোটি টাকা খরচ করে তৈরি করা যাবে বিদ্যুত প্লান্ট।৫০মেগাওয়াটের এই প্লান্ট থেকে প্রতিদিন উতপন্ন হবে ৩১ লাখ ২০হাজার টাকার বিদ্যুত।৫০থেকে ৬০ বছর স্থায়ী হবে এই প্লান্ট ।এক বছরে প্লান্ট থেকে বিদ্যুত পাওয়া যাবে ১১৪কোটি টাকার।এই বিষ্কর উদ্‌ভাবনকে কাজে লাগানো গেলে বিদ্যুতের আর কোন সঙ্কট থাকবেনা। গ্যাসের জন্য কমে যাবে উদ্বেগ।আর এ পাথরকুচি পাতা চাষ করে কৃষকের ঘরেও আসবে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা।এক একর জমিতে পাথরকুচি আবাদ করে বছরে ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুত উতপাদন করা যাবে। এর ফলে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে প্লান্ট তৈরি করে বিদ্যুতের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি অনেক লোকের কর্মসংস্থানও করা সম্ভব হবে।

১৬·পর্যটন
বিশ্ব পর্যটন শিল্পের মহাসচিব ফ্রান্সিকো ফ্রাংগিউলি বাংলাদেশ সফরে এসে বলেন, বাংলাদেশ পর্যটন শিল্পের বিপুল সম্ভাবনার অসাধারণ সৌন্দর্যমন্ডিত দেশ। এখানে পর্যটন শিল্প বিকাশের জন্য উন্নত প্রযুক্তি বা মূলধনের প্রয়োযন নেই। বরং দেশের বিদ্যমান প্রাকৃতিক সম্পদ ও মানব সৃষ্ট সুবিধাদি দ্বারাই এ শিল্পকে উন্নত করা যায়।
পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার আর বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ ফরেষ্ট সুন্দরবন রয়েছে বাংলাদেশে।রয়েল বেঙ্গল টাইগার আমাদের গর্ব। রয়েছে নওগাঁর পাহাড়পুরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বৌদ্ধবিহার। ঢাকার লালবাগ কেল্লা,বাগের হাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ,সিলেটের চা বাগান ছাড়াও দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য পর্যটন ষ্পট।

১৭·সম্ভাবনার দুগ্ধশিল্প
দুগ্ধশিল্প। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর ২০০৮ দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছিল,৩৬৬ কোটি টাকা উতপাদন মুখী পশু স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ করা হলে এবং উন্নত মানের গোখাদ্যের নিশ্চয়তা দিতে পারলে দেশি দুধের উতপাদন দ্বিগুন করা সম্ভব। অর্থাত ২১ লাখ ৫৬ হাজার টন তরল দুধ বাজারে যোগ করা যাবে।

১৮·চা
বাংলাদেশ তৃতীয় বৃহত্তম চা রপ্তানিকারক দেশ। উত্তরাঞ্চলের পঞ্চগড়ের মাটি চা উতপাদনের জন্য খুবই উপযোগী। চা উতপাদনে সিলেটের মাটিতে যেসব গুণাবলী রয়েছে পঞ্চগড়েও সেসব গুণাবলী রয়েছে। দিনাজপুর, ঠাঁকুরগাঁও এবং রংপুর অঞ্চলে ভারতের বিখ্যাত দার্জিলিং প্রজাপতির চা উতপাদন করতে পারলে অন্যন্য কৃষি পণ্যেও তুলনায় তিনগুণ লাভবান হওয়া সম্ভব।
১৯·কয়লা
বিশেষজ্ঞগণ বলেন,বাংলাদেশে যে পরিমান কয়লা মজুদ আছে তা উত্তোলন করতে পারলে ২০০ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা সম্ভব।বড়পুকুরিয়ায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত উতপাদন ২০৫-৩০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করা সম্ভব।

Thursday, April 2, 2009

পিলখানা নৃশংসতা: স্বপ্নের বন্দরে রক্তক্ষরণ

স্বপ্নের বন্দরে রক্তক্ষরণ:
কীযে বিষণœ লাগছে। সমস্ত চরাচরে যেন ঢেকে আছে বিষাদে। কয়েকদিন থেকে আমার মনটা ভাল নেই। আমি গিয়েছিলাম ঢাকা মেডিকেলের মর্গে। সেনা অফিসারদের লাশ দেখেই আর বাঁধ মানলনা অশ্র“ধারা। গত কয়েকদিন আগেওতো এরা প্রত্যেকে ছিলেন একেকজন ব্যক্তি। প্রত্যেকের ছিল একেকটা আকাশ। এঁদের প্রত্যেকের জন্মের পরে আজান দেওয়া হয়েছে। বাবা-মা ভাইবোন আত্মীয় পরিজন নিয়ে প্রত্যেকের আছে বেড়ে ওঠার ইতিহাস। স্কুলে গিয়ে দুষ্টুমি কিংবা অসাধারণ কোনো কৃতিত্বের গল্প। মেধাবি একেকজন মানুষ ছিলেন এঁরা। অনেকেই ক্যাডেট কলেজের চৌকস ছাত্র। বিতর্ক, লেখালেখি, সংস্কৃতি চর্চায় ছিলেন উজ্জ্বল। অথচ মাত্র ৩৩ ঘন্টার মধ্যেই হলিখেলায় স্তব্ধ বাতাস।
\ দুই \
২৫ ফেব্র“য়ারি, বুধবার। সকাল থেকেই দাবি আদায়ের নামে বিডিআর জওয়ানেরা সদর দপ্তরে ভয়াবহ তান্ডব চালায়। তারা দরবার হলে গুলি করে পদস্থ কর্মকর্তাদের হত্যা করে। অনেকের মরদেহ নর্দমায় ফেলে দেয়। এঁদের মরদেহ পরে নদীতে ভাসতে দেখা যায়। পদস্থ কর্মকর্তার স্ত্রী ও সন্তানদের ভেতর জিম্মি করে নির্যাতন চালানো হয় বলে জানা যায়। দীর্ঘ সময় তাদের অভূক্ত অবস্থায় অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে রাখে উচ্ছৃঙ্খল জওয়ানেরা। অনেক বাড়িঘর ও যানবাহনেও আগুন ধরিয়ে দেয় তারা। তাদের গুলিতে সদর দপ্তরের বাইরেও অনেক হতাহত হয়।
\ তিন \
২৬ ফেব্র“য়ারি, বৃহস্পতিবার। ৩৩ ঘন্টার শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার পর বিডিআর জওয়ানদের আত্মসমর্পনের মধ্যদিয়ে তাদের রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহের অবসান হয়েছে। কয়েক দফায় দীর্ঘ আলোচনার পর ২৬ ফেব্র“য়ারি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ছয়টায় বিডিআর সদর দপ্তরের সব জওয়ান তাদের অস্ত্র পুলিশের হাতে তুলে দেয়। এর পরই পুলিশ আলো নিভিয়ে সদর দপ্তরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়।
\ চার \
বাতাস ভারি হয় কান্নায়
ছবির মতো মানুষ। টেলিফোন করেছিল তার প্রিয়তমা স্ত্রী সাথীকে। বলেছিল, সাথী দেখা হলেতো ভালো, না হলে ক্ষমা করে দিও। আর হুইল চেয়ার থেকে যেন তোমার হাত না সরে! আমৃত্যু এই কথাটা রাখবে তুমি সাথী! মেজর হুমায়ুন হায়দার পাবলো। তাঁর ছেলের নাম রেখেছিল ঋত্বিক। ঋত্বিক হুইল চেয়ারে দিন কাটায়। রাতে শুধু বিছানাতে ঘুমায়। আর আছে রূপন্তি। পাবলোর রাজকন্যা। ছয়মাসের মতো বয়স। সাথী এখন কী করবে ? ফরেন মিশনসহ সব ধরনের ইনকাম জড়ো করে পাবলো ঋত্বিকের পেছনেই খরচ করত। দারুনভাবে অসুস্থ ছেলেটা যদি একটু ভালো থাকে। আজ পাবলো নেই। ছোট্র রূপন্তিকে নিয়ে দূর্গম সংসার যাত্রায় হুইল চেয়ারের পেছনে কীভাবে থাকবে এখন সাথীর শক্ত হাত ?


\ পাঁচ \
“ওরা আমাদের ডিজি স্যার শাকিল আহমেদকে হত্যা করেছে। আমি দরবার হলে ভয়ানক বিপদে আছি। তোমরা ভালো থেকো।“ এই ছিল বিডিআর সদর দপ্তর পিলখানায় নিহত মেজর আহমেদ আজিজুল হাকিম পলাশের জীবনের শেষ কথা। স্ত্রী আকলিমা খাতুন রেবার সঙ্গে ২৫ ফেব্র“য়ারি সকালে বিডিআরদের হাতে জিম্মি অবস্থায় ফোন করে কথা বলেন মেজর পলাশ। কিন্তু ফোনের কথা শেষ না হতেই স্তব্ধ হয়ে যায় তার কÚ। শতবার চেষ্টা করেও পলাশের কÚ আর শোনা যায়নি। হয়ত সে সময়েই তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। মোবাইল ফোনটি চালু থাকায় রেবা শুনেছেন সেখানকার অন্যদের আর্তনাদ আর প্রচন্ড গোলাগুলির শব্দ। প্রায় ৫ মিনিট পর মেজর পলাশের মোবাইল ফোনটি বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকার পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরের দরবার হলের ভেতরে কথিত বিডিআর বিদ্রোহের নারকীয় শিকার হয়ে প্রাণ দিতে হয় সদা হাস্যোজ্জল মেজর পলাশকে।
\ ছয় \
২৫ ফেব্র“য়ারি অফিসে যাবার কিছুক্ষণ পরেই স্ত্রীর মোবাইলে ফোন দেন মেজর মোশাররফ। স্ত্রী লিপি রিসিভ করতেই শুনতে পান গুলির শব্দ। মোশাররফ লিপিকে জানান, দরবার হলে জওয়ানরা এ্যাটাক করেছে। তুমি একটু সাবধানে থেক। ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে রেখ। এই বলে ফোনটি রেখে দেন মোশাররফ। এরপর মোশাররফ ফোন করেন ছোট ভাই মোবারক হোসেনকে। মোবারক বলেছেন, পিলখানায় যুদ্ধাবস্থা, তুই তোর ভাবি আর আকিবকে বাঁচা। এরপর আর শত চেষ্টা করেও মোবারক ও লিপি মোশাররফের ফোনে সংযোগ পাননি। সন্তান সম্ভবা লিপি নিজের অসুস্থতার কথা বলে কোনো মতে রেহাই পান সেদিন। পরেরদিন পিলখানা থেকে বেরিয়ে এলেও স্বামীর আর কোন খোঁজ পাননি। ২৭ ফেব্র“য়ারি সকাল সাড়ে দশটার দিকে পিলখানার ১৩ ব্যাটালিয়নের কাছ থেকে যে দশটি লাশ পাওয়া যায় সেখান থেকে শনাক্ত করা হয় মেজর মোশাররফের মৃতদেহ। পরেরদিন গ্রামের বাড়িতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে দাফন করা হয়।
\ সাত \
২৫ ফেব্র“য়ারি সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে ছেলে লে. কর্ণেল রবি রহমানের ফোন পেয়েছিল বাবা ফয়জুর রহমান। ফোনে সন্তানের ভয়ার্ত কÚ বিচলিত করে তোলে তাকে। বাবাকে রবি বলেন, পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহ করেছে। সেনা কর্মকর্তাদের জিম্মি করা হয়েছে। সন্তানের এ খবরে চিন্তিত হয়ে পড়েন তিনি। পাঁচ মিনিট পর আবারও ফোন আসে। লে. কর্ণেল রবি বাবাকে বললেন, বাবা আর মনে হয় তোমাদের সঙ্গে দেখা হবে না। তোমরা আমাকে ক্ষমা করে দিও। যদি বেঁচে না থাকি তাহলে মায়ের পাশে আমাকে কবর দিও। তারপর রবির সঙ্গে আর যোগাযোগ হয়নি বাবার। বারবার চেষ্টা করেও তার পরিবারের সদস্যরা কর্ণেল রবি রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। সেনাবাহিনী পিলখানায় ঢুকে যে গণকবর আবিস্কার করে তার মধ্যে পাওয়া যায় লে. কর্ণেল রবির মৃতদেহ।
\ আট \
নীড়ে আর ফেরা হলো না
নীড়-বিয়ানীবাজার উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের টিকরপাড়ার কাউদিয়া গ্রামের একটি বাড়ীর নাম। এলাকার লোকজন বলত সুখের নীড়। এই পরিবারের ছেলে মেয়েরা উচ্চ শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত। অথচ এই সুখের নীড় থেকেই এখন ভেসে আসছে শুধুই কান্নার শব্দ। প্রায় দুই বছর আগে ৩৬ রাইফেলস ব্যাটালিয়নের সিও হিসেবে এনায়েত বিডিআরে যোগদান করেন। বাবা মরহুম মুশফিকুর রহমান চৌধুরী ঢাকায় ব্যবসা করার সুবাদে এনায়েতরা সব ভাই-ই উচ্চ শিক্ষা অর্জনে ঢাকার বাসিন্দা হয়ে যান। তবু ছুটি পেলেই বিয়ানী বাজারের আপন নীড়ে মায়ের কোলে ছুটে আসতেন এনায়েত। মায়ের প্রতি এত যার টান তার মুখটা শেষবারের মতো দেখা হলো না মায়ের। এনায়েতের মরদেহটাও আনা গেল না নীড়ে। গত ১ মার্চ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
\ নয় \
আমরা মারত্মক বিপদে আছি
২৫ ফেব্র“য়ারি সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে বিডিআর সদর দপ্তরের দরবার হলে গুলিবর্ষণ শুরু হওয়ার পর শেষবারের মতো লে. কর্ণেল এলাহী মঞ্জুরের সঙ্গে কথা হয় তার স্ত্রী তান্নি মঞ্জুর চৌধুরীর। এ সময় মঞ্জুর ফোন করে স্ত্রীকে জানান, আমরা মারাত্মক বিপদে আছি। আমরা পাঁচজন অফিসার একটি বাথরুমে লুকিয়ে আছি। ছেলেমেয়েদের তুমি সাবধানে ও নিরাপদে থেক। এই ছিল একান্ত স্বজনদের সঙ্গে শেষ কথা। এরপর এলাহী মঞ্জুরের মোবাইল ফোনে বার বার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করতে পারেননি স্বজনেরা। গত ৪ মার্চ ক্ষতবিক্ষত দেহের আঙ্গুলের ছাপ পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে যে মৃতদেহগুলো পড়ে আছে সেগুলোর একটি মঞ্জুরের।
\ দশ \
কোথাও গেলে তো আব্বু আবার ফিরে আসে,
মারা গেলে কেন ফিরে আসবেন না ?
আমি ভালো আছি, চিন্তা করনা। ২৫ ফেব্র“য়ারি ১১ টা ৪৫মিনিটে পিলখানায় আটকা অবস্থা থেকে স্ত্রী উর্মিকে মোবাইল ফোনে এই কথাটা বলেছিলেন লে. কর্ণেল সাজ্জাদুর রহমান। কিন্তু উর্মির চিন্তা তো আর এসব নিষেধাজ্ঞা মানতে চায়না। তার দুশ্চিন্তাগুলো সেদিনের বিডিআর জওয়ানদের মতোই উচ্ছৃঙ্খল হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত শারমিন নিশাত উর্মির দুশ্চিন্তাই সত্যি হল। লে. কর্ণেল সাজ্জাদ স্ত্রীকে দেয়া শেষ কথাটা আর রাখতে পারলেন না। ভালো আর থাকা হলো না সাজ্জাদের। বিভ্রান্ত জওয়ানদের বীভৎসতায় পিলখানার গণকবরের ঘটনার প্রায় ৫৮ ঘন্টা পর খোঁজ মেলে সাজ্জাদুর রহমান দোলনের মরদেহের। দোলন আর উর্মি দম্পতির দুই ছেলে ইত্তেশাদ (১১) ও ইশাদ (৭) এর দিন কাটছে বাবার পথ চেয়ে। ইত্তেশাদ রাইফেল পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের ৫ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। ইশাদকে তার মা বলেছেন বাবা মারা গেছেন। ইশাদ জিজ্ঞেস করেছে-মারা যাওয়া থেকে কখন আসবেন ? আব্বু তো প্রায়ই অনেক জায়গায় যান। শান্তি মিশনে, যুদ্ধে, বাজারে-সব জায়গা থেকেই তো ফিরে আসেন। মারা যাওয়া থেকে আসবেন না কেন ? সরল শিশুটির জিজ্ঞাসা।
\ এগার \
বইমেলায় যাওয়া হলো না সাইতী ও সুহার
“দেখ, তোমাদের সময় দিতে পারি। চাকরিজীবনে কাটিয়েছি বিদেশে। আর এখন চলছে বিডিআর সপ্তাহ। সেজন্য এই কয়টা দিন ব্যস্ত থাকব। তারপরও কথা দিচ্ছি আগামী ২৮ ফেব্র“য়ারি সময় দেব। সুহা এবং তোমাকে নিয়ে যাব বই মেলায়।“ কথাগুলো বলেছিলেন সেনা কর্মকর্তা মেজর আসাদুজ্জামানের স্ত্রী সাইয়ারা সুলতানা সাইতীকে গত ২৫ ফেব্র“য়ারি। কিন্তু মেলায় আর যাওয়া হয়নি। ঘাতক বিডিআর জওয়ানদের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন মেজর আসাদ। গত ২৮ ফেব্র“য়ারি ছিল তার ৬ষ্ঠ বিবাহ বার্ষিকী। তার আগেই তিনি প্রাণ হারান। রেখে যান স্ত্রী এবং কন্যাকে। গত ২৭ ফেব্র“য়ারি রাতে পিলখানায় গণকবর থেকে মেজর আসাদের লাশ উদ্ধার করা হয়।
\ বার \
দেখার কেউ নেই
“বাবা বলেছিলেন এখন লেখাপড়া কর, দরবার থেকে ফিরে খেলা দেখাতে নিয়ে যাব, বাসায় অনেক আঙ্কেল এসেছিলেন কিন্তু বাবা আর আসেননি।“ এভাবে কাদতে কাদতে কথাগুলো বলছিল ঢাকার পিলখানার ঘটনায় নিহত দরবার হলের ক্লার্ক নায়েক বসির উদ্দিন বিশ্বাসের চার বছর বয়সী শিশুপুত্র অপু। গত ২৭ ফেব্র“য়ারি রাতে বসিরের (ব্যাচ নং-৬০৮৩৫) লাশ ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার মতনেজা গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। এখন তার স্ত্রী ও শিশু সন্তানকে দেখার কেউ নেই।
\ তের \
বিপ্লবের মোড়কে
মানবতার অপমান
সিডরের মতো হঠাৎ আসা এ ঝড় সামাল দেওয়ার মতো সাহস ও শক্তি হারিয়ে গেছে এ পরিবারগুলোর। আমরা স্তব্ধ, শোকাহত, হতবাক। কোনও সামরিক যুদ্ধ নয়, কোনও সেনা অভ্যুত্থান নয়, তথাকথিত বিপ্লবের রঙচঙে মোড়কে স্রেফ খুন করা হয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় সেনা কর্মকর্তা আর তাদের পরিবার পরিজনকে। সাধারণ ক্ষোভকে পুঁজি করে কূটকৌশল এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে ডিজি শাকিল আহমেদ সহ বিডিআরে কর্মরত সেনা অফিসারদের। ক্ষোভের কারণ থাকতে পারে, অসন্তোষ থাকতে পারে, কিন্তু তা ইন্ধন যোগাবে একটি গণহত্যার- এটি মেনে নেওয়া যায়না।

শেষ কথা
অশ্র“ মুছে তাকাতে হবে সামনে ...
এত এত সফল উজ্জ্বল মেধাবী চৌকস মানুষ হারিয়ে সত্যি সত্যি কাঁদছি। আজকের আকাশটা যেন ভারি হয়ে আছে, প্রকৃতিও যেন কাঁদছে। কিন্তু বুঝি, শুধু কাঁদার সময় এটা নয়, কান্না মুছে জাতিকে আবার সামনের দিকে তাকাতে হবে। সরকারের সামনে, নেতাদের সামনে, সেনাবাহিনীর সামনে, বিডিআরের সামনে কত যে করণীয়। গণতন্ত্র নস্যাৎ, বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিঘœ করা আরও কত যে গভীর সুদূর প্রসারী অসদুদ্দেশ্য থেকে এই হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে ! তদন্তের মাধ্যমেই সেটা উদ্ঘাটন করা সম্ভব। আর গণতন্ত্রকে রক্ষা করে যেতে হবে চোখের মণির মতো। এ ব্যাপারে আমাদের সরকার ও সামরিক বাহিনীর ভূমিকা দেশবাসী ও বিশ্ববাসীর কাছে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছে।
বাংলাদেশের মানুষের একটা বৈশিষ্ট হলো আমরা অপরাজেয়। দুর্যোগে দুর্বিপাকের আঘাতে খানিকক্ষণের জন্য হয়তো হেলে পড়ি, কিন্তু আবার উঠে দাঁড়াই আমরা। পরাজয় মেনে নিই না। আমাদের জাতীয় জীবনের একটা বড় বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি বটে কিন্তু এবারও বাংলাদেশের মানুষ হেরে যাবে না। আমরা আমাদের শোককে শক্তিতে পরিণত করে সামনের দিকে এগিয়ে যাব। শুধু পরিবারগুলো তাদের স্বজনদের আর ফিরে পাবে না, এই কথা ভাবলেই আবার আমার চোখটা জলে ভেসে যায়।